ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলের টাইগ্রের আলামাতা শহর ও আশপাশে তিন দিনের তীব্র সংঘর্ষে অন্তত ৫২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।
ধারণা করা হচ্ছে, সরকারি বাহিনী আঞ্চলিক যোদ্ধাদের কাছ থেকে আলামাতা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এখন তারা টাইগ্রের প্রধান শহর মেকেলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে আলামাতার রাস্তায় সেনাবাহিনীর ট্যাংক দেখা গেছে।
টাইগ্রে অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী দল ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা চলছিল। গত সপ্তাহে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। ২০২২ সালে দুই বছরের গৃহযুদ্ধ শেষ করার যে চুক্তি হয়েছিল, সেটি ভাঙার জন্য দুই পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে। সংঘর্ষের প্রভাব আশপাশের এলাকাতেও পড়েছে। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান লালিবেলায় গত এক সপ্তাহ ধরে ৩৩ জন পর্যটক আটকে আছেন।
লালিবেলায় থাকা এক ব্রিটিশ পর্যটক বিবিসিকে বলেন, পুরো সপ্তাহজুড়ে আমরা লড়াই, গুলি ও ভারী কামানের গোলার শব্দ শুনেছি। শহরে সেনাবাহিনীর বড় উপস্থিতি রয়েছে বলেও জানান তিনি।
লালিবেলা ১৩ শতকে পাথর কেটে তৈরি ১৩টি গির্জার জন্য বিখ্যাত। অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের কাছে শহরটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র স্থান।
গত বুধবার বিমানবন্দরটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বেশির ভাগ পর্যটক শহরটি ছাড়তে পারেননি।
তবে সোমবার সামরিক হেলিকপ্টারে করে ১৪ জন ইসরায়েলি পর্যটককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। লালিবেলার আশপাশের সংঘর্ষে সরকারি বাহিনী ও আমহারা অঞ্চলের একটি মিলিশিয়া জড়িত। ওই মিলিশিয়া টাইগ্রের যোদ্ধাদের সঙ্গে জোট করেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে তারা আরো কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে সাত সদস্যের একটি জোট গঠন করে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল রাজধানী আদ্দিস আবাবায় থাকা সরকারকে সরিয়ে দেওয়া। এই সংঘাতে প্রতিবেশী ইরিত্রিয়াও জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইথিওপিয়ার সরকার অভিযোগ করেছে, ইরিত্রিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করছে। তবে ইরিত্রিয়া এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
টাইগ্রে ও আশপাশের এলাকায় সরাসরি সংবাদ সংগ্রহ করতে পারছে না বিবিসি। যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ থাকায় সেখানে কী ঘটছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষ কে শুরু করেছে, তা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট বা টিপিএলএফ বলছে, কেন্দ্রীয় সরকারের হামলার জবাবে তারা পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ওই হামলায় ড্রোনও ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি করেছে তারা। অন্যদিকে ইথিওপিয়ার সরকার বলছে, টাইগ্রের বাহিনীই প্রথম হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, টাইগ্রের বাহিনী বিমানবন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর হামলা শুরু করে। টিপিএলএফের যোদ্ধারা আফার অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকাতেও লড়াই করছে। আফার ইথিওপিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলটি স্থলবেষ্টিত ইথিওপিয়াকে জিবুতি ও দেশটির বন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেছে।
আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা মেডসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের (এমএসএফ) জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে টাইগ্রেতে তাদের সহায়তা পাওয়া হাসপাতালগুলোতে ৭০০ জনের বেশি আহত মানুষ ভর্তি হয়েছেন। আলামাতা জেনারেল হাসপাতালের এক চিকিৎসক বিবিসিকে জানান, শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত শহর ও আশপাশের এলাকায় লড়াই হয়েছে। এতে ভারী বিস্ফোরক ও কামান ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু হামলায় আবাসিক বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে মাত্র তিন দিন বয়সী শিশুও রয়েছে। নিহত হয়েছেন নারী ও গবাদিপশু চরানো মানুষও। ওই চিকিৎসক জানান, শহরের বাজারে একটি হামলায় একসঙ্গে ১২ জন নিহত হয়েছেন।
লড়াই শুরুর পর টাইগ্রেতে ব্যাংকিং সেবা বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। ইন্টারনেট সংযোগও বন্ধ রয়েছে। তবে এসব সেবা বন্ধের নির্দেশ কে দিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
আলামাতার একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, সেখানে মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হচ্ছে। লড়াই থেকে পালিয়ে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ায় শহরটি এখন ভিড়ে পূর্ণ। ওই ব্যক্তি বলেন, আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা হেঁটে আলামাতায় আসছেন। কেউ কেউ এক ঘণ্টা পর্যন্ত হেঁটে এসেছেন। তারা ভেবেছিলেন, শহরটি নিরাপদ হবে। কিন্তু শহরে ব্যাংকিং সেবা, টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও ফোন—কোনোটিই চালু নেই। ফলে মানুষ বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছেন।
লালিবেলায় থাকা ব্রিটিশ পর্যটক জানান, সেখানে অনলাইন ব্যাংকিং চালু থাকলেও নগদ টাকার সংকট রয়েছে। তিনি বলেন, গত দুই দিনে লালিবেলার পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে। তবে বিমানবন্দর এখনো সামরিক বাহিনী ব্যবহার করছে। বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরটি আবার চালু হতে পারে বলে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আরো জানান, স্থানীয় মানুষ এখনো ভয় ও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। শহরে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে এবং বড় একটি সামরিক দলকে উত্তরের দিকে যেতে দেখা গেছে।
বিমানবন্দর বন্ধ হওয়ার সময় লালিবেলায় ৫৩ জন পর্যটক ছিলেন। পরে কয়েকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সোমবার ১৪ জন ইসরায়েলি পর্যটককে বিমানপথে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর আগের দিন আরো পাঁচজন একটি বেসরকারি সংস্থার গাড়িবহরে করে শহর ছেড়েছেন। লালিবেলায় এখনো আটকা পর্যটকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দলটি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের। এ ছাড়া ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকরাও রয়েছেন। ইথিওপিয়া ও নিউজিল্যান্ডের দ্বৈত নাগরিক এবং একজন মেক্সিকান নাগরিকও সেখানে আটকা রয়েছেন।
টেলিযোগাযোগ বন্ধ থাকায় টাইগ্রেতে আটকে থাকা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আদ্দিস আবাবাভিত্তিক টাইগ্রে ব্রডকাস্টিং সার্ভিস (টিবিএস) একটি উদ্যোগ নিয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেলটি জানিয়েছে, টাইগ্রের বাইরে থাকা মানুষের কাছ থেকে টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে ভিডিও বার্তা নেওয়া হবে। পরে সেসব বার্তা স্যাটেলাইট টেলিভিশনে প্রচার করা হবে। এসব বার্তায় শুভেচ্ছা ও সাম্প্রতিক খবর জানানো যাবে। যোগাযোগ বন্ধ থাকার মধ্যে পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এদিকে টাইগ্রের ব্যাংকিং সেবার ওপর সরকারি বিধিনিষেধের প্রভাব অঞ্চলটির বাইরে থাকা টাইগ্রিয়ানদের ওপরও পড়েছে।
কয়েকজন গ্রাহক বিবিসিকে জানিয়েছেন, টাইগ্রেতে খোলা তাদের ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অথবা সেগুলোর ওপর বিধি-নিষেধ দেওয়া হয়েছে।
পিপলসনিউজ/আরইউ