এক দশক আগে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৮ বিলিয়ন ডলারের মতো। ২০২৫ সালের শেষে তা তিন গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ বিলিয়ন ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির এই হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি শুধু মালদ্বীপে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিদেশি ঋণের পরিমাণ বাড়লেও রপ্তানি আয়ের তুলনায় বাংলাদেশের ঋণের বোঝা পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের চেয়ে কম। তবে ভারত ও নেপালের তুলনায় বেশি।
ঋণ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৫ সালে এ ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বিদেশি ঋণের মোট পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের অর্থনীতি আপাতত ঋণের এসব সূচক সামলানোর মতো অবস্থায় রয়েছে। তবে এই হারে ঋণ বাড়তে থাকলে এবং ধার করা অর্থ যথাযথভাবে কাজে না লাগালে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিদেশি ঋণ ভারতের। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৭৬৪ বিলিয়ন ডলার; যা গত ১০ বছরে ৫৯ শতাংশ বেড়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১৩৫ বিলিয়ন ডলার। এক দশকে দেশটির ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার বিদেশি ঋণ ৩১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭ বিলিয়ন ডলারে। নেপালের ঋণ বেড়েছে ১৮৬ দশমিক পাঁচ শতাংশ; যা ১১ বিলিয়ন ডলার। ভুটানের বিদেশি ঋণ ৫৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছে তিন দশমিক তিন বিলিয়ন ডলার। আর মালদ্বীপের ঋণ বেড়েছে চার গুণের বেশি; যা দাঁড়িয়েছে চার দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ১৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে। আগের বছরের তুলনায় এ হার তিন দশমিক এক শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। অর্থাৎ বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে রপ্তানি আয়ের যে অংশ ব্যয় হয়, তা কমেছে। ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার জন্য এটি ইতিবাচক লক্ষণ।
তবে এ হার এখনো ভারতের চেয়ে বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার গড় হার ১০ শতাংশ। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় এ হার ২৬ শতাংশ এবং ভুটানে ১৯ শতাংশ।
মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) তুলনায় বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের ব্যয় কম। বাংলাদেশের ব্যয়ের হার জিএনআইয়ের দুই শতাংশ; যা ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের সমান। তবে শ্রীলঙ্কায় এ হার পাঁচ শতাংশ এবং ভুটানে ছয় শতাংশ।
জাতীয় আয়ের তুলনায় বিদেশি ঋণের অনুপাত ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের মোট জাতীয় আয়ের ২৪ শতাংশের সমান বিদেশি ঋণ রয়েছে বাংলাদেশের। আপাতত এ হার সামলানোর মতো অবস্থায় থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার সম্মিলিত গড় ২১ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি। ভারতে এ হার ২০ শতাংশ, পাকিস্তানে ৪১ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৫৪ শতাংশ।
তবে রপ্তানি আয়ের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের ঋণের বোঝা অনেক বেশি বলে মনে হয়। দেশটির বার্ষিক রপ্তানি আয়ের ২১০ শতাংশের সমান বিদেশি ঋণ। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি ও অন্যান্য খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়, বিদেশি ঋণের পরিমাণ তার দ্বিগুণের বেশি।
ভারতের ক্ষেত্রে এ হার ৮৩ শতাংশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৯৫ শতাংশ। তবে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পাকিস্তানে ৩২৪ শতাংশ, ভুটানে ৩০১ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ২৭২ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ঋণের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ এখনো পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে।
তিনি বলেন, বিদেশি ঋণ বর্তমান গতিতে বাড়তে থাকলে একসময় বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।
জাহিদ হোসেন আরও বলেন, কী ধরনের ঋণ নেওয়া হচ্ছে এবং সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সতর্ক না হলে বাংলাদেশ আরেকটি শ্রীলঙ্কায় পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
তবে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করা কঠিন বলে মনে করেন তিনি। কারণ দেশটির ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিস্থিতি আলাদা।
জাহিদ হোসেন বলেন, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে রপ্তানি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঋণ ও জিডিপির অনুপাত দিয়ে একটি দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা খুব একটা বোঝা যায় না। অর্থনীতির আকার বড় হলেই যথেষ্ট নয়, ঋণ পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত তারল্যও থাকতে হয়। এ কারণেই রপ্তানি আয়ের সঙ্গে ঋণের অনুপাত গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, বাংলাদেশ কিছুটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ দেশের রপ্তানি পণ্যের পরিসর ছোট এবং একটি নির্দিষ্ট পণ্যশ্রেণির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। জিডিপির তুলনায় রপ্তানির অনুপাত যেসব দেশে সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ সেগুলোর একটি।
তিনি বলেন, রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে অবদান রাখে। তবে রেমিট্যান্স হিসাবের মধ্যে ধরলেও ভারত বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবে। কারণ দেশটির রেমিট্যান্স আয় অনেক বেশি। একইভাবে শ্রীলঙ্কায় বিপুলসংখ্যক পর্যটক যান। পর্যটন খাত থেকেও দেশটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জিডিপি ও রপ্তানি আয়ের তুলনায় ঋণের অনুপাত ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো নিট রপ্তানি আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের ব্যয়ের অনুপাত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ খাতে দেশীয় মূল্য সংযোজনের হার ৬০-৬৫ শতাংশ। ফলে মোট রপ্তানি আয়ের পরিবর্তে নিট রপ্তানি আয় বিবেচনায় নিলে ঋণের অনুপাত আরও অনেক বেশি হবে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নেওয়া ঋণগুলোর সুদের হার তুলনামূলক বেশি। পাশাপাশি এসব ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ও ছাড়কালও কম। ফলে আগামী কয়েক বছরে ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়বে। এমনিতেই বাংলাদেশ ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছে।
গত অর্থবছরে সরকারের বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল চার দশমিক নয় বিলিয়ন ডলার। ২০২৯ সাল নাগাদ তা বেড়ে সাত দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ঋণের সুদের হার বাড়ার পাশাপাশি পরিশোধের মেয়াদ ও ছাড়কাল কমে আসায় এ ব্যয় বাড়বে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশকে রপ্তানি বাড়াতে হবে, পণ্যে দেশীয় মূল্য সংযোজনের পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং দেশের ভেতর থেকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতাও কমাতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে ঋণ ও অর্থায়নের পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের প্রয়োজন এখনো থাকবে। তবে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও ভালো শর্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং সহজ শর্তের ঋণ সংগ্রহে জোর দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার বন্ড ছেড়েও অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোট বিদেশি ঋণ পাঁচ দশমিক পাঁচ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড নয় দশমিক চার ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২১ সালের পর ঋণ বৃদ্ধির এ হার সবচেয়ে বেশি। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের গড় বৃদ্ধির তুলনায় তা প্রায় চার গুণ।
বিশ্বজুড়ে সুদের হার বেশি থাকায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপও বেশি ছিল। ২০২৫ সালে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো ঋণের আসল ও সুদ বাবদ মোট এক দশমিক চার ট্রিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। আগের বছরের তুলনায় এ ব্যয় বেড়েছে এক দশমিক নয় শতাংশ। টানা পঞ্চম বছরের মতো ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়ল।
২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নতুন করে পাওয়া অর্থায়নের চেয়ে ৪৩৬ বিলিয়ন ডলার বেশি ঋণ পরিশোধ করেছে উন্নয়নশীল দেশগুলো।
পিপলসনিউজ/আরইউ