রাজধানীর ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা–৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হয়েছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলাটি করেন। মামলায় গাজী নজরুল, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমসহ তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। অপর আসামি হলেন মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমান।
পুলিশ জানিয়েছে, মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় করা এ মামলায় গাজী নজরুল ও মাকসুদাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন। অবশ্য তিনি প্রথমে বলেছিলেন, ওবায়দুরকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তিনি জানান, ওবায়দুর পলাতক।
রোববার সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর বিল্ডিংয়ের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের (১৯) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটটি গাজী নজরুলের। তিনি এই ফ্ল্যাটে তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন।
ফ্ল্যাটটির একটি কক্ষের দরজা ভেঙে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ, সিআইডি, পিবিআই ও ডিবির দল ঘটনাস্থলে যায়। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য লাশ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।
মামলার বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামের এস এম মাসুম বিল্লাহ পেশায় একজন মুদিদোকানদার। তার বড় মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে গত জুনে ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের (৭৫) বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই ন্যাম ভবনের বাসায় গাজী নজরুল তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে বসবাস করতেন। বাসায় তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদাও (৬৫) একসঙ্গে থাকেন। এজাহারভুক্ত আসামি ওবায়দুরের (৩৮) প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় এ বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর থেকেই স্বামী ও তার প্রথম স্ত্রী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে শারীরিক–মানসিক নির্যাতন করতেন। নির্যাতনের বিষয়টি মরিয়ম বিভিন্ন সময় মোবাইল ফোনে তার পরিবারকে জানাতেন।
মামলায় বলা হয়, রোববার বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন গাজী নজরুল। খবর পেয়ে মরিয়মের বাবা তার শ্যালিকা সুফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে পৌঁছান। দেখতে পান, বাসায় অনেক মানুষের ভিড়। পরে তিনি জানতে পারেন, বাসার ভেতরের রুমে গলায় ফাঁস দিয়েছেন মরিয়ম। রুমের দরজা ভেতর থেকে লাগানো ছিল। পরে শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশের সহায়তায় ও উপস্থিত লোকজনের মাধ্যমে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে মরিয়মকে ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়। এ সময় মরিয়মের বিছানার ওপর থেকে একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. ফজলুল করিম বলেন, প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, চিরকুটটি মরিয়মের হতে পারে। তবে লেখাটি মরিয়মের কি না, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলা যাবে।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, গাজী নজরুলসহ গ্রেপ্তার দুই আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে কি না, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গাজী নজরুল জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত জুলাইয়ে তার ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এক তরুণীর সঙ্গে তাকে দেখা যায়। পরে গাজী নজরুল ইসলাম জানান, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম।
এরপর গত ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলটির পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্পিকার, নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়।
চিরকুটে যা লিখে গেছেন মরিয়ম: মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের সময় বেশ কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ কমিশনার ফজলুল করিম বলেন, মরিয়ম যে রুমে থাকতো, সে রুম থেকে তার লেখা কিছু চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে।
একটি চিরকুটে লেখা আছে, শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…।
আরেকটিতে লেখা, আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবইবা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমিতো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি। আমি হেরেছি তুমি জিতেছো, কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষ দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।
আরেকটি চিরকুটে আছে দুটি লেখা। একটিতে আছে, সে ছিলো অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ এর…!!! আর আমি ছিলাম বোকা…!!!অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!!
অপর লেখায় আছে, কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশির সম্মানের। কারণ ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়…ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!
পিপলসনিউজ/আরইউ