দেশে একই সঙ্গে ভয়াবহ হয়ে উঠছে ডেঙ্গু ও হাম পরিস্থিতি। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ ১০ জনের মৃত্যু এবং প্রায় দুই হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮১ জনে।
অন্যদিকে, হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয়জনের মৃত্যু এবং এক হাজার ২৯১ জনের হাসপাতালে আসার তথ্য মিলেছে; এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়েছে এক হাজার।
দীর্ঘস্থায়ী হাম প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তৈরি করেছে বাড়তি চাপ। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানো, ঢাকা মেডিকেলে মোবাইল বা ফিল্ড হাসপাতাল চালু এবং ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সময়ে হামের বিস্তার ঠেকাতে প্রায় ৩৪ লাখ টিকাবঞ্চিত শিশুকে লক্ষ্য করে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর এই ভয়াবহতার পেছনে অন্যতম বড় কারণ মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ও জাতীয় নির্দেশিকা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়া। ২০২১ সালে প্রণীত জাতীয় নির্দেশিকায় বছরজুড়ে মশক নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মপরিকল্পনা, নিয়মিত পরিস্থিতি প্রতিবেদন এবং লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণের কথা থাকলেও বাস্তবে এসবের অনেকটাই কার্যকর হচ্ছে না। ফলে সেপ্টেম্বরের পর অক্টোবরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
অন্যদিকে, হামের দীর্ঘস্থায়ী প্রাদুর্ভাব টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে। সব মিলিয়ে ডেঙ্গু ও হাম— দুই সংক্রামক রোগের একযোগে বিস্তার শুধু হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে না, বরং রোগ প্রতিরোধ, টিকাদান, মশক নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ ১০ মৃত্যু : দেশে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরো ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম উপসর্গে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ও হামবিষয়ক পৃথক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। ডেঙ্গু বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৯৯৬ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সরকারের হিসাবে, চলতি বছর এডিস মশাবাহিত এ রোগে একদিনে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যু। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয় আগের দিন; নয়জন। দেশে এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে ২৮১ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে চলতি অক্টোবর মাসের ছয় দিনে প্রাণ গেল ৩৬ জনের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক বুলেটিনে বলা হয়, সোমবার সকাল ৮টা থেকে ২৪ ঘণ্টায় এডিস মশাবাহিত এ রোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ২৯৪ জন ভর্তি হয়েছেন, দক্ষিণ সিটিতে ভর্তি হন ১৮৭ জন। দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি হন ৪৮০ জন।
অন্যান্য বিভাগের মধ্যে বরিশালে ২০৩ জন, চট্টগ্রামে ২৪২ জন, খুলনায় ৩০২ জন, ময়মনসিংহে ৯৬, রাজশাহী ১৯৯, রংপুরে ৭৫ এবং সিলেটে ১৮ জন ভর্তি হয়েছেন। বুলেটিনের তথ্য অনুসারে, গত ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৯৬৪ জন ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। চলতি বছর ৯০ হাজার ৩৫৬ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৮৪ হাজার ২৯৯ জন হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন।
বুলেটিন অনুসারে, চলতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে সর্বোচ্চ রোগী ভর্তি ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন এবং ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। গত বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় চার শতাধিক মানুষের, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজারের মতো।
হাম উপসর্গে আরও ৬ মৃত্যু, রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ছুঁইছুঁই : দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক হাজার ২৯১ জন রোগী হাসপাতালে এসেছেন। মারা গেছেন ছয় জন। এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগী বেড়ে দাঁড়াল এক লাখ ৯৯ হাজার ১৩ জন। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে এক লাখ ৭৬ হাজার ৫১৬ জন। চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে এক লাখ ৬৯ হাজার ২৯০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম বিষয়ক বুলেটিনে বলা হয়েছে, হামের উপসর্গ নিয়ে সোমবার সকাল ৮টার পর ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল ও কুষ্টিয়ায় এক জন করে মারা গেছেন। চলতি বছরের এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়াল এক হাজার ৩২ জনে। হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ গেছে ১০২ জনের। সেই হিসাবে হামে মোট এক হাজার ১৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, হামের উপসর্গে মোট প্রাণহানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৬৮ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এরপরেই আছে সিলেট বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ১৭৯ জন। এ ছাড়া রাজশাহীতে ৯৩, চট্টগ্রামে ৯০, ময়মনসিংহে ৮০, বরিশালে ৬১, খুলনায় ৪৫ ও রংপুর বিভাগে ১৬ জন মারা গেছে।
বুলেটিনে বলা হয়, গত একদিনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এক হাজার ২৯১ জন রোগী উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসেন। যার মধ্যে এক হাজার ১৮০ জন ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে হাম শনাক্ত হয়েছে ১০২ জনের শরীরে।
হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩৭১ জন, চট্টগ্রামে ২৬০, সিলেটে ১৬৩, বরিশালে ১২৩, খুলনায় ১১১, ময়মনসিংহ ৮৫, রাজশাহীতে ২৯ ও রংপুরে ৩৮ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে হাম এবং ছোঁয়াচে এ রোগের উপসর্গে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাব রাখছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। হাসপাতালে আসা সব রোগী কিংবা হাসপাতালের বাইরে থাকা রোগীদের সবার হাম পরীক্ষা হয় না। ফলে হাম শনাক্ত হওয়া রোগীর সঠিক সংখ্যা পাওয়া যায় না। কেবল হাসপাতালে আসা বা ভর্তি রোগীর তথ্য নথিভুক্ত করা হয়।
হাম পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ: হাম পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ ২০২৬ থেকে বাংলাদেশে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব চলছে। হামে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু। গুরুতর আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপও বেড়েছে। হাম পরিস্থিতির পেছনে টিকাদানের ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাব দেশের টিকাদান কর্মসূচিতে বিদ্যমান রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি ও ব্যবস্থাগত দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। হাম মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৩৪ লাখ টিকাবঞ্চিত বা আগে বাদ পড়ে যাওয়া শিশুকে লক্ষ্য করে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। এ কর্মসূচিতে ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় সরকার দেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি ও টিকা-নির্ভর রোগের নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে একটি স্বাধীন পর্যালোচনাও শুরু করেছে। ৪ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই পর্যালোচনায় দেশের আটটি বিভাগেই বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে। এর লক্ষ্য হলো টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নির্ধারণ করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই পর্যালোচনায় টিকা সরবরাহ, সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যকর্মী, টিকাদানের আওতা, রোগ নজরদারি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ, ফিল্ড হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনা : দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোকে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এই নির্দেশনায় ঢাকার হাসপাতালগুলোকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা খালি করতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কিছু রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে সরিয়ে নেওয়া কথা ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি ঢামেক হাসপাতালে একটি ফিল্ড হাসপাতাল চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে রোববার অনুষ্ঠিত এক সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিস্তারিত পর্যালোচনা করে। এর পরে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা আসে বলে কর্মকর্তারা জানান। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রোববার ক্যানসার চিকিৎসাবিষয়ক এক সভার ফাঁকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) নুরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একটি উপায় হলো, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে জায়গা থাকলে ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কিছু রোগীকে সেখানে সরিয়ে নেওয়া। এতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অতিরিক্ত কিছু শয্যা পাওয়া যাবে।’
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন বলেন, প্রস্তাবটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং কীভাবে এগোনো হবে, তা নির্ধারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ বৈঠক করবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। নির্ধারিত জায়গার বাইরে বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীদের রাখতে হচ্ছে।’ ‘আমরা যে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করেছি, সেটিও চালু করার কথা ভাবছি,’ বলেন ফরহাদ। অন্যান্য সিদ্ধান্তের বিষয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে শয্যা সংখ্যা আরও বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কুর্মিটোলা মাল্টিডিসিপ্লিনারি হাসপাতালকে রাজধানীর বাইরে থেকে আসা ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে বলা হয়েছে।
সংকটের সময়ও সরকারি হাসপাতালগুলো রোগী ফিরিয়ে দেয় না। তবে রোগীর সংখ্যা হাসপাতালের বিদ্যমান শয্যা সক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে রোগীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, যোগ করেন নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, তাই ঢাকার বাইরের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা সংখ্যা বাড়াতে বলা হয়েছে।
ঢাকার হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন চিকিৎসকেরাও। তাদের ভাষ্য, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল থেকে অনেক রোগী উন্নত চিকিৎসার আশায়, কোনো রেফারেল ছাড়াই রাজধানীতে আসেন। এতে এসব হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত ভিড় আরও বেড়ে যায়।
তারা বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নেই। সেই সঙ্গে এ সংক্রান্ত অন্যান্য সুবিধা ও চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক রোগীকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে হয়।
মশক নিয়ন্ত্রণে মানা হচ্ছে না জাতীয় নির্দেশিকা : মশক নিয়ন্ত্রণে ২০২১ সালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে ‘ডঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে জাতীয় নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করা হয়। এরপর রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের জন্য প্রণয়ন করা হয় ‘মশক নিধন স্থায়ী নির্দেশিকা’। দুই নির্দেশিকাতেই মশক নিয়ন্ত্রণে করণীয়, মশককর্মী, তদারককারীসহ সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিবছর ১৫ জানুয়ারির মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী ছয় মাসের মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করার কথা। কিন্তু স্থানীয় সরকারের একাধিক স্তরে কথা বলে জানা গেছে, এ ধরনের কর্মপরিকল্পনা কোনো পর্যায় থেকেই স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো হয়নি।
নির্দেশিকায় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনকে প্রতি মাসে মশার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের কথাও রয়েছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কমিটি আছে বা থাকার কথা এমন তথ্যই অনেকে জানেন না।
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের নিজ নিজ ওয়ার্ডে মশার বিস্তার সম্পর্কে প্রতি মাসে চেয়ারম্যানকে জানানোর কথা রয়েছে। বিভিন্ন এলাকার বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তাদের কেউই এ কাজ করেননি। এমনকি জাতীয় নির্দেশিকার বিষয়েও তাদের অনেকের জানা নেই।
সিটি করপোরেশনও মানছে না নির্দেশিকা : জাতীয় ও স্থানীয় নির্দেশিকার শুরুতেই বছরজুড়ে মশক নিধন কার্যক্রম চালু রাখার কথা বলা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি ময়লা, পচা পানি, নালা-নর্দমা, ড্রেন, সেপটিক ট্যাঙ্ক, জলাভূমি, ঝোপঝাড় ও পরিত্যক্ত পাত্রে সকাল-বিকেল ওষুধ প্রয়োগের নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া লার্ভা ধ্বংসে সকালে এবং উড়ন্ত মশা নিধনে বিকেলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে কীটনাশক প্রয়োগের কথা থাকলেও তা হচ্ছে না।
কোনো বাসাবাড়ির ভেতরে এডিস মশার প্রজননস্থলের তথ্য পাওয়া গেলে সেখানে ওষুধ প্রয়োগ বা ফগিং করে উৎসস্থল ধ্বংস করার কথা। এ ক্ষেত্রে ভবন বা অবকাঠামোর মালিকের কাছ থেকে নির্ধারিত কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার বিধান রয়েছে।
কিউলেক্স মশার ক্ষেত্রে কোনো ভবন মালিক তার ভবনের বেজমেন্ট বা অভ্যন্তরে ওষুধ ছিটাতে চাইলে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ে আবেদন করার কথা। বাস্তবে এমন আবেদন খুব একটা হয় না। কেউ কেউ মৌখিকভাবে স্থানীয় কাউন্সিলরকে ফোন করে বাসার নিচে ওষুধ ছিটানোর অনুরোধ করেন। অনেক ক্ষেত্রে মশককর্মীদের দেখলে বাসিন্দারা তাদের অনুরোধ করে বাসার ভেতরে ওষুধ ছিটিয়ে নেন। আবার অভিযোগ রয়েছে, টাকা না দিলে মশককর্মীরা বাড়ির ভেতরে ওষুধ ছিটান না।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী জানান, গত তিন বছর তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করে মশা নিধনে ব্যবস্থা নিয়েছেন। তবে এটি কার্যকর পদ্ধতি নয়। তাই তারা নিজেরাই মশার উৎপত্তিস্থল শনাক্ত করছেন। ঢাকার বড় ১০ হাসপাতাল থেকে এক হাজার ৬৭২টি রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে ১০০টি এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে। সেই জায়গাগুলোতে দৈনিক ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবী দিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সারাদেশে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিধনে অভিযান চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এখন তাদের পরিকল্পনা হলো হাসপাতাল, স্কুল ও মন্দিরে কীটনাশক ছাড়াই এডিসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মশা ধরতে আধুনিক ফাঁদ ‘বিজি সেন্টিনেল ট্র্যাপ’ বসানো। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিসের লার্ভা ধ্বংসে ওষুধ প্রয়োগ এবং পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনে স্প্রে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি সারাদেশে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর কথা বলা হয়েছে।
ইমরুল কায়েস বলেন, বাসাবাড়ি, হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় জমে থাকা পানি এবং পরিত্যক্ত পাত্রে এডিস মশার প্রজনন হয়। তাই সরকারি কার্যক্রমের পাশাপাশি বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং জমে থাকা পানি অপসারণে সাধারণ মানুষের সচেতনতা জরুরি।
যা বললেন বিশেষজ্ঞরা: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবীরুল বাশার বলেন, আমরা আগেই ডেঙ্গুর উচ্চ সংক্রমণের আশঙ্কা করেছিলাম। বারবার মশা নিধনের পরামর্শ দিয়েছি। তারপরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এক ধরনের অবহেলা দেখা গেছে।
তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি মাসে ডেঙ্গুতে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতি আগামী মাস পর্যন্ত চলার আশঙ্কা রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি নেওয়ার আহ্বান জানান এ কীটতত্ত্ববিদ।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, প্রতিবছরই মানুষ ডেঙ্গুর নতুন ধরনে আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুদের মধ্যে যাদের শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হচ্ছে, তাদের কেউ কেউ দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। শুধু ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়া শিশু নয়, ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলেও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। কারণ, শিশুরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে নতুন করে ৩০০ শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও বিভিন্ন ওয়ার্ডের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে অতিরিক্ত রোগী রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেখানে একটি মোবাইল হাসপাতালের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোনো সরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কোনো হাসপাতালে শয্যা না থাকলে নির্ধারিত অন্য হাসপাতালে রোগী পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এসব শয্যাও পূর্ণ হয়ে গেলে আরও জায়গা প্রস্তুত করার নির্দেশনা রয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করছে কিনা, তা যাচাই করার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো হাসপাতাল রোগী নিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
পিপলসনিউজ/আরইউ