পুলিশে বড় ধরনের সাংগঠনিক ও শৃঙ্খলাগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে পুলিশের জন্য আলাদা ‘সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট’ গঠন করা হবে।
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিবাদী শক্তির দোসরদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়ে এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
পাশাপাশি পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে গোপনে তথ্য বা অন্যভাবে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী। দায়িত্বে অবহেলা বা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি অপরাধের ক্ষেত্রে ফৌজদারি ব্যবস্থাও নেওয়ার কথা জানান তিনি।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬-এর পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে সাহস ও বীরত্ব, সেবায় অনন্য অবদান, গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত এবং উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে চার ক্যাটাগরিতে ৯২ পুলিশ সদস্যকে পদক দেওয়া হয়।
একই অনুষ্ঠানে পুলিশের গোয়েন্দা সক্ষমতা আরো কার্যকরভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় মেট্রো, বিভাগ ও জেলা পর্যায় পর্যন্ত নতুন ইউনিটের কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিবাদের দোসরদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশকে গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে যারা এসব ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে ভূমিকা রাখবেন তাদের পুরস্কৃত করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যারা ফ্যাসিবাদের, আওয়ামী শক্তির দোসরদের আইনের আওতায় আনতে পারবে, তাদের আমরা পুরস্কৃত করব। গত সপ্তাহে এরকম দুজন ফ্যাসিবাদের শক্ত দোসর গ্রেপ্তার হয়েছে, শুক্রবারও একজন হয়েছে।
তিনি বলেন, এতদিন এখানেই লুকিয়ে ছিল তারা। আমাদের ইন্টেলিজেন্স সাপোর্ট কোথায় ছিল? পুলিশের ইন্টেলিজেন্স সাপোর্টকে আমি সবচাইতে উত্তম মনে করি। অন্যান্য অর্গানাইজেশনের যে ইন্টেলিজেন্স সাপোর্ট, সেটা আমি মিলিয়ে দেখার জন্য নিই, কম্পেয়ার করার জন্য। আপনাদের ইন্টেলিজেন্স সাপোর্ট আপনারা ইউজ করুন।
দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এক মাসে এ দেশের প্রায় এক হাজার ৪০০ নাগরিক হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সঙ্গে গত ১৭ বছরের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও হেফাজতে মৃত্যুর বিভিন্ন হিসাবের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যারা এক মাসে ১৪০০ মানুষকে হত্যা করতে পারে, আসমান থেকে গুলি করে দেশের নাগরিকদের হত্যা করতে পারে, যারা বাংলাদেশের সমস্ত ইনস্টিটিউশনকে দলীয়করণ করে এ দেশকে গণতন্ত্রহীন একটা রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল, সেই শক্তিকে বাংলাদেশের মানুষ কি কখনো আহ্বান জানাবে? এ দেশের মানুষ কখনো চাইতে পারে তারা বাংলাদেশের রাজনীতি করুক?
তিনি আরো বলেন, যারা সেই বর্বর হত্যাকাণ্ডের পরেও কোনোদিন দুঃখ প্রকাশ করেনি, অনুশুচনা করেনি, ক্ষমা প্রার্থনা করেনি, তারা বাংলাদেশের বাইরে থেকে আওয়াজ দিচ্ছে।
শেখ হাসিনাসহ সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের ফেরত আনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের কাছে অফিশিয়ালি রিকোয়েস্ট করেছি অ্যাজ পার এক্সট্রাডিশন ট্রিটি যে, আপনারা সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের, শেখ হাসিনাসহ অন্য আসামিদের ফেরত দেন।
মন্ত্রী আরো বলেন, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হলে আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। তারা যদি স্বেচ্ছায় আসে, আইনের মুখোমুখি হয়, তাহলে তো ভালো। আইন নিজস্ব গতিতে চলবে, আইনের নিজের কোর্স অনুযায়ী চলবে।
পুলিশের নতুন ইউনিট গঠনের ঘোষণা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘আগামী সপ্তাহে একটা আলাদা সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠন করা হবে। নতুন এই ‘সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট’ একজন অ্যাডিশনাল আইজিপি (অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। পুলিশ সদর দপ্তরে এই পদটি না থাকলে তা নতুন করে তৈরি করা হবে।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সমস্ত মেট্রো, ডিভিশন ও ডিস্ট্রিক্ট পর্যায়ে তার শাখা থাকবে। থানা ও জেলাপর্যায়ে সাইবার সিকিউরিটি ইউনিটের আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকবে। বড় আকারের ফরেনসিক ল্যাব ও যে সাপোর্ট দরকার, সেগুলো হেডকোয়ার্টার ও ডিভিশন পর্যায়ে থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘সেটা প্রকল্প প্রণয়নের জন্য আমি গত কয়েক সপ্তাহ আগে নির্দেশ দিয়েছি। যেগুলো জটিল হবে, সেগুলো কেন্দ্রে আসবে। যেগুলো থানা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে অ্যানালাইসিস করা সম্ভব, সেগুলো সেখানেই হবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেখেছি, সাইবার স্পেস ক্রিয়েট করে যেসব ক্রাইম হচ্ছে, সেটা আধুনিক ক্রাইম প্রবণতার একটা ক্যারেক্টার। কোনো কোনো রাষ্ট্রে ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত ক্রাইম হচ্ছে এই সাইবার বা স্ক্যামভিত্তিক। সে জন্য এটা আমাদের গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।’
পুলিশের কারও কারও বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে গোপনে সহযোগিতার তথ্য আছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে পুলিশকে কঠোর হতে হবে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা জনগণের প্রত্যাশা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলে তার পরিণতি ভালো হবে না।
মন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পুলিশের কেউ কেউ গোপনে সংবাদ দিয়ে বা অন্যভাবে সহযোগিতা করছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। পুলিশের মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন না করা, দায়িত্বে অবহেলা করার ঘটনাও আছে। ধীরে ধীরে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং পুলিশ সদস্যদের সংশোধনের সুযোগও দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।
জনগণ পুলিশকে রাজাবাদশার মতো দেখতে চায় না উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণ জনবান্ধব পুলিশ দেখতে চায়। কোনো জায়গায় গিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এমন কোনো কর্মকাণ্ড করবেন না, যা জনগণের চোখে অস্বাভাবিক বা অগণতান্ত্রিক মনে হয়। অধস্তনদেরও এমন আচরণের অনুমতি বা প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক ভিত্তি, জন-আকাঙ্ক্ষা, ব্যাপক জনপ্রত্যাশা এবং দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর গঠিত সরকারের ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। সরকার পুরস্কার ও শাস্তির নীতিতে বিশ্বাস করে। প্রতিনিয়ত সৃষ্টির পালন ও দুষ্টের দমন চলছে। তিনি বলেন, ‘হয়তো শতভাগ ন্যায়বিচার আমরা প্রত্যেকের কাছে পালন করতে পারছি না, বাস্তবায়ন করতে পারছি না। কিন্তু সময় ফুরিয়ে যায়। মেসেজ একটাই। আশা করি, মেসেজটা পেয়েছেন।’
পুলিশের সদস্যদের নিজেদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তৃণমূল পর্যায় থেকে আইজিপি পর্যন্ত সবার কাছে তার একটাই বার্তা-সমাজের প্রয়োজন, রাষ্ট্রের প্রয়োজন, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনপ্রত্যাশা পূরণের জন্য পুলিশকে কঠোর হতে হবে।
তিনি বলেন, ‘যারা ফ্যাসিবাদী শক্তি, তারা অন্যান্য বাহিনীর মতো পুলিশ বাহিনীকেও অপব্যবহার করেছে, রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে, নির্যাতন করেছে, জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। অনেকে বাধ্য হয়েছেন অবৈধ নির্দেশ পালন করতে। কিন্তু আমরা আপনাদের সবাইকে সংশোধনের, আস্থা অর্জনের সুযোগ দিয়েছি।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শুধু বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার মধ্যে বিষয়গুলো সীমাবদ্ধ থাকবে না। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে একই সঙ্গে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভাগীয় কার্যক্রম, শাস্তি, তিরস্কারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৯২ সদস্য পেলেন পুলিশ পদক: সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন, সেবায় অনন্য নজির স্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত এবং উদ্ভাবনীমূলক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে ৯২ পুলিশ সদস্যকে পুলিশ পদক দেওয়া হয়েছে।
শনিবার সকালে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাদের হাতে এসব পদক তুলে দেন।
এর আগে, গত সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে পদকপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ করা হয়।
এতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন, সেবায় অনন্য নজির স্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত এবং অন্যান্য উদ্ভাবনীমূলক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে চারটি ক্যাটাগরিতে মোট ৯২ জন পুলিশ সদস্যকে পদক দেওয়া হয়েছে।
ক্যাটাগরিগুলো হলো— ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)’, ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)-সেবা’, ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)’ এবং ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)-সেবা’।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পিপলসনিউজ/আরইউ