রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের ভয়াবহ বর্জ্য সংকট মেটাতে ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শুরু হতে যাচ্ছে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অধীনে আমিন বাজারে বাস্তবায়নাধীন এই ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন এবং বছরে প্রায় ১০ লাখ টন গৃহস্থালির বর্জ্য পোড়ানো হবে। চীনা প্রতিষ্ঠান ‘চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন’ (সিএমইসি)-এর সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে সরকারি বিনিয়োগ ছাড়াই বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা শহরের বিশাল ময়লার ভাগাড়ের চাপ কমবে এবং জাতীয় গ্রিডে বার্ষিক ৩৭০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।
পাশাপাশি প্রকল্পটির ফলে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত ‘ফ্লাই অ্যাশ’ বা ছাই ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ (ডাই-অক্সিন ও ফিউরানের নির্গমন), পানি ও মাটি দূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে পরিবেশবিদদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যদিও আধুনিক উন্নত প্রযুক্তি (ফ্লু-গ্যাস ট্রিটমেন্ট, ফিল্টার ও উচ্চ তাপমাত্রা) কার্যকরভাবে পরিচালনা ও কঠোর তদারকি করা গেলে খোলা আকাশের নিচে জমে থাকা বর্জ্যরে বিষাক্ত প্রভাব কমবে এবং বিদ্যুৎ পাওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণের একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশদূষণ রোধ করার জন্যই এই প্রকল্প নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজেই কেউ সস্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে যাতে উল্টো পরিবেশ দূষণ না করতে পারে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
পরিবেশবিদ শরীফ জামিল বলেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলে বর্জ্য পোড়াতে হবে। এতে বায়ুদূষণ একেবারেই হবে না, এটা বলা সম্ভব না। তবে উন্নত টেকনোলজি ব্যবহার করে হয়তো দূষণ কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, এই কেন্দ্র নির্মাণ বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা, তা খেয়াল রাখতে হবে। কেননা, আইনে যে মানের কথা বারবার বলা হয়, এবার সে আইন সংশোধন করা হচ্ছে। সেটিও আমাদের নজরে রাখতে হবে।’
পরিবেশবিদদের মতে, খোলা জায়গায় বর্জ্য পড়ে থাকলে তা থেকে শুধু দুর্গন্ধই ছড়ায় না, পরিবেশের ওপরও নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। বর্জ্য পচে বিভিন্ন দূষিত গ্যাস ও জীবাণু তৈরি হয় এবং মাছি, মশা ও ইঁদুরের মতো রোগবাহক প্রাণীর বিস্তার ঘটে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে বর্জ্য থেকে তৈরি লিচেট মাটিতে ঢুকে ভূগর্ভস্থ পানি ও আশপাশের খাল-নদী দূষিত করতে পারে। একইসঙ্গে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য মাটিতে মিশে দীর্ঘমেয়াদি দূষণ সৃষ্টি করে। শুকনো বর্জ্যে আগুন লাগলে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে বায়ুদূষণ আরও বাড়তে পারে।
বিইআরসির সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ‘পরিবেশদূষণের যে শঙ্কা করা হচ্ছে, তার চেয়ে বড় অর্জন হবে বিশাল ময়লার ভাগাড় পরিষ্কার হবে। পাশাপাশি পাওয়া যাবে বিদ্যুৎ। ফলে এর উপকারিতা অনেক বেশি। আর বিশ্বের বহু দেশে এখন এই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। তারা আধুনিক টেকনোলজিই ব্যবহার করে থাকে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর চীনে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) সদর দফতরে উত্তর ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের অর্থায়ন চুক্তি সই হয়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, উত্তর ঢাকার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প হলো বাংলাদেশের প্রথম বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ তৈরির উদ্যোগ। গৃহস্থালির বর্জ্যকে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তর করার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক তাৎপর্য বহন করে।
প্রসঙ্গত, প্রকল্পটি দৈনিক তিন হাজার টন গৃহস্থালির বর্জ্য পোড়ানোর জন্য এবং বার্ষিক ৩৭০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের প্রথম বর্জ্য পোড়ানো বিদ্যুৎ প্রকল্প। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ২৫ টাকা প্রতি ইউনিট দরে এই বিদ্যুৎ কিনবে সরকার।
এর আগে গত ২৭ আগস্ট সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেন, খরচটা একটু বেশি হবে, কিন্তু আমাদের লাভটা অন্য জায়গায় আছে। আমরা তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনবো প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে। এটা এমনিতে মনে হচ্ছে অনেক বেশি। কিন্তু আমাদের ময়লা আবর্জনাগুলো তো তারা ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং সেখানে যে ময়লা আবর্জনা ওয়েস্ট থাকছে, সেখান থেকে জৈব সার হচ্ছে। তারা ল্যান্ডফিল ব্যবহার করবে, এটার জন্য তারা সিটি করপোরেশনকে মাসিক একটা ভাড়া দেবে এবং এই জায়গায় বাংলাদেশ সরকারের বিন্দুমাত্র কোনও ইনভেস্ট করতে হচ্ছে না। ময়লা আবর্জনা এই জাতির জন্য, ঢাকা শহরের জন্য একটা বড় বোঝা।
চীনের গণমাধ্যম চায়না ডেইলির তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্লান্টগুলোতে সাধারণ দূষণকারী হিসেবে সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও কণার মাত্রা অনলাইনে পর্যবেক্ষণ করা হয়— আগুনের তাপমাত্রা সাধারণ অবস্থায় অন্তত ৮৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখার বিধান রয়েছে, যা ডাই-অক্সিন কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সীমা ছাড়ালে জরিমানা, উৎপাদন সীমিত বা প্লান্ট বন্ধের ব্যবস্থাও রয়েছে।
পিপলসনিউজ/আরইউ