বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ আরও তিন বছর পিছিয়েছে। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর মাসে এলডিসি উত্তরণ হবে বাংলাদেশের।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের প্ল্যানারি মিটিংয়ে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান।
বৈঠকের শুরুতে জি-৭৭–এর পক্ষে উরুগুয়ের প্রতিনিধি বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কোনো দেশের প্রতিনিধি এর বিরোধিতা করেননি। ফ্রান্স, কানাডা ও আয়ারল্যান্ডের (ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে) প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের সময় পেছানোর বিষয়ে সমর্থন দিয়ে বক্তব্য দেন। তবে সবাই তাদের বক্তব্যে বাংলাদেশে সংস্কারের তাগিদ দেন।
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বাংলাদেশের অনুরোধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে গত ২১ জুলাই সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)।
এর আগে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করে মত দেয়, বাংলাদেশ ও নেপালের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধ সাধারণ পরিষদে বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা উচিত। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই ইকোসক বিষয়টি সাধারণ পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
আগামী ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হওয়ার কথা ছিল। এই উত্তরণ হলে পুরোদমে উন্নয়নশীল দেশ হবে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ নিজেদের সদস্যদেশগুলোকে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ— এই দুই ভাগে বিভক্তি করে। এলডিসি তালিকার দেশগুলোও উন্নয়নশীল দেশ। উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে যারা একটু পিছিয়ে থাকে, অন্য দেশের সহায়তা লাগে— এমন দেশকে এলডিসিভুক্ত করা হয়।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমল পর্যন্ত ২০২৬ সালেই এলডিসি উত্তরণের বিষয়ে অনঢ় থাকার নীতি অব্যাহত রাখা হয়। পরে বিএনপি সরকার গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে।
সরকারের যুক্তি, সময়সীমা বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কার সংহত করা ও স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির (এসটিএস) অধীন অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুযোগ পাওয়া যাবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এলডিসি উত্তরণে পাঁচ বছরের প্রস্তুতি সময় একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটে ‘গুরুতরভাবে ব্যাহত’ হয়েছে।
বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও তার প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি, বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে বিলম্ব, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা। দেশি সংকটের মধ্যে আছে আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এখনো নিষ্পত্তি না হওয়া।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার সুবাদে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা সুযোগ পেয়ে এসেছে। এলডিসি থেকে কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)।
তিন বছর অন্তর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা— এই তিন সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়, কোনো দেশ উত্তরণের যোগ্য কি না। যেকোনো দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয়, অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব মানদণ্ড অবশ্য পরিবর্তিত হয়।
বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। সেগুলো হলো মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক (ইভিআই)। ২০২১ সালেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে। কিন্তু করোনার কারণে উত্তরণ দুই বছর পিছিয়েছে, তা না হলে আরও দুই বছর আগেই উত্তরণ হয়ে যেত।
বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক একেএম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, এ সিদ্ধান্তের পুরো কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিতে চাই। বিএনপি যখন বিরোধী দলের রাজনীতি করছিল, তখনই তারেক রহমান প্রথম উপলব্ধি করেন, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এবং দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর আগে এলডিসি থেকে উত্তরণ দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের জাতিসংঘ মিশনের কর্মকর্তারাও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন। এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সবারই ভালো ভূমিকা ছিল।
সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর জানিয়েছেন, বাড়তি সময় কাজে লাগিয়ে ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
অ্যামচেমের সাবেক সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, এলডিসি উত্তরণকে শুধু ঝুঁকি হিসেবে না দেখে অর্থনীতির কাঠামো বদলের সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। কম মজুরি ও সস্তা শ্রমনির্ভর প্রবৃদ্ধির বদলে দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে জোর দিতে হবে। তৈরি পোশাকের বাইরে কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, প্রযুক্তি, নতুন উদ্যোগ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাত বিকাশেরও প্রয়োজন রয়েছে। তার মতে, বাড়তি তিন বছর পাওয়া গেলেও প্রস্তুতির জন্য সময় সীমিত।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হারানো ব্যবসার প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর বড় ধাক্কা হতে পারে। বাড়তি সময় কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। সংস্কারের অগ্রগতি জনসমক্ষে প্রকাশের জন্য একটি ড্যাশবোর্ড চালুর প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, রপ্তানিকারকদের বাণিজ্যচুক্তি এবং পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসন সংক্রান্ত (ইএসজি) মানদণ্ড পূরণের প্রস্তুতিও নিতে হবে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য। তবে একে স্বস্তির অবকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং অর্থনীতির দুর্বলতা কাটিয়ে এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করার প্রস্তুতি জোরদারে বাড়তি সময় কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য কোন সংস্কার কখন বাস্তবায়ন করা হবে, কোন প্রতিষ্ঠান দায়িত্বে থাকবে এবং অগ্রগতি কিভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নির্দিষ্ট করে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও রাজস্ব, ব্যাংকিং ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে অগ্রগতি না হলে শুধু উত্তরণের সময় বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান হবে না।
পিপলসনিউজ/আরইউ