রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর স্থপতি (চলতি দায়িত্ব) মোস্তাক আহমেদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবন সংস্কারে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন এবং অনুমোদিত নকশা ও কার্যাদেশ ছাড়া কাজ পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি তদন্ত কমিটি এ ঘটনায় তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ তিন কর্মকর্তাকে দায়ী করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথির বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া রূপায়ণ হাউজিং-সংক্রান্ত একটি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায়ও তাঁর নাম আসামি হিসেবে রয়েছে বলে দেওয়া তথ্যে জানা গেছে।
তবে এসব অভিযোগের পর তাঁর বিরুদ্ধে কী ধরনের চূড়ান্ত প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। রাজউকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও মন্ত্রণালয়ের তদন্তের মধ্যে মতপার্থক্য, সংস্কারকাজের ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মোস্তাক আহমেদ দীর্ঘদিন রাজউকের স্থাপত্য শাখায় উপ-নগর স্থপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে তাঁকে নিয়মিত পদোন্নতির পরিবর্তে চলতি দায়িত্বে প্রধান নগর স্থপতির পদে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। মতিঝিলে রাজউক অ্যানেক্স ভবনের স্থাপত্য শাখা থেকে তিনি দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
রাজউকের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে স্থাপত্য নকশা, পরামর্শক নিয়োগ, কারিগরি মূল্যায়ন ও পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে এই পদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। পূর্বাচল নতুন শহরে পাঁচ তারকা হোটেল ও পর্যটন ইনস্টিটিউটের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, মতিঝিলের পার্ক ও লেক উন্নয়ন, উত্তরা বাণিজ্যিক ভবন এবং উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের মতো উদ্যোগে তাঁর দাপ্তরিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ড্যাপ পর্যালোচনা, ইমারত নির্মাণ বিধিমালার খসড়া এবং গুলশান-বনানী এলাকার ভবনের পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা-সংক্রান্ত কারিগরি কমিটিতেও তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে।
যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি দায়িত্বে নিয়োগ পাওয়া নিজে কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। তাঁর নিয়োগের আদেশ, প্রযোজ্য চাকরিবিধি এবং পদোন্নতি-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা ছাড়া এ বিষয়ে কোনো বিধি লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. ছিদ্দিকুর রহমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গুলশান-২-এর সরকারি বাংলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভবনটির ড্যাম্প প্রতিরোধ, পলেস্তারা ও ছাদ মেরামতের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০ লাখ টাকার প্রাক্কলন তৈরি করা হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।
পরে রাজউকের আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা ভবনটি পরিদর্শন করে সেটিকে বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেন এবং সংস্কারের পরিবর্তে নতুন ভবন নির্মাণের সুপারিশ করেছিলেন বলে নথির বিবরণে দাবি করা হয়েছে। এই সুপারিশের পরও সংস্কারকাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০২৪ সালের ৯ মে মোস্তাক আহমেদকে আহ্বায়ক এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাহাত মুসলেমিনকে সদস্যসচিব করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ১৫ মে অনুষ্ঠিত সভায় নকশা প্রণয়ন, প্রাক্কলন তৈরি এবং সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কাজ শেষ করার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অনুমোদিত নকশা ও আনুষ্ঠানিক কার্যাদেশ ছাড়াই মৌখিক নির্দেশে কাজ শুরু হয়। রাজউকের অন্য প্রকল্পে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে (এনডিই) দিয়ে সংস্কারকাজ করানোর অভিযোগও রয়েছে।
২০২৪ সালের ৬ জুন রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কাইছার লিখিত নির্দেশনা, পূর্ণাঙ্গ স্থাপত্য নকশা ও অনুমোদিত পরিকল্পনা চেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন বলে সরবরাহ করা নথির বিবরণে বলা হয়েছে। তিন দিন পর ওই চিঠি প্রত্যাহার করা হয় বলেও দাবি করা হয়েছে। চিঠি প্রত্যাহারের কারণ এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
সংস্কারকাজের ব্যয় নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রাথমিক প্রাক্কলন ও পরবর্তী অঙ্কের পার্থক্য থেকে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকার প্রাক্কলনে স্বাক্ষর করার জন্য তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী উজ্জ্বল মল্লিকের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ২ কোটি ১৬ লাখ টাকার সংশোধিত প্রাক্কলন তৈরি করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রাথমিক ৩০ লাখ টাকার প্রাক্কলনের তুলনায় সংশোধিত অঙ্ক সাত গুণের বেশি। তবে প্রাক্কলন দুটির বিস্তারিত খাত, কাজের পরিধি, উপকরণের পরিমাণ এবং মূল্যায়নের ভিত্তি যাচাই ছাড়া শুধু অঙ্কের পার্থক্য দিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় বা দুর্নীতি চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
আরেকটি অভিযোগ হলো, কাজের বড় অংশ শেষ হওয়ার পর ই-জিপিতে দরপত্র আহ্বান করে মেসার্স নিয়াজ ট্রেডার্সকে কাগজে-কলমে ঠিকাদার দেখানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা আরো বলছেন, অভিযোগ সত্য হলে দরপত্রের সময়সূচি, কার্যাদেশ, বিল, কাজের পরিমাপবই এবং অর্থ পরিশোধের নথি পর্যালোচনা করে দায়িত্ব নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বাংলো সংস্কার নিয়ে রাজউকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্তের ফলাফলে পার্থক্যের কথা বলা হয়েছে।
সরবরাহ করা বিবরণ অনুযায়ী, রাজউকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি কাজের বড় অংশ শেষ হওয়ার পর দরপত্র আহ্বান এবং ব্যয়ের অসংগতির অভিযোগ তুলে তৎকালীন চেয়ারম্যান ছিদ্দিকুর রহমান, মোস্তাক আহমেদ ও রাহাত মুসলেমিনকে দায়ী করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল।
মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রধান যুগ্ম সচিব জহিরুল ইসলাম খান নথিপত্র ও সরেজমিন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছিলেন বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
তবে দুই তদন্ত প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ কপি, কমিটি গঠনের আদেশ এবং প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ মিলিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ তদন্তের প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ হিসেবে ১৩ মে ২০২৪ উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ একই বিবরণে কমিটির সভার তারিখ ১৫ মে বলা হয়েছে। এই সময়গত অসংগতি মূল নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পর মোস্তাক আহমেদ ও রাহাত মুসলেমিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। তবে নোটিশের জবাব, পরবর্তী বিভাগীয় কার্যক্রম এবং চূড়ান্ত আদেশের তথ্য পাওয়া না গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের অনুকূলে ভবনের নকশা অনুমোদনে বিধি লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দুদকের একটি মামলায় মোস্তাক আহমেদের নাম ১৯ নম্বর আসামি হিসেবে রয়েছে বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল, সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রোকন উদ-দৌলাসহ রাজউকের কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, শুধু অভিযোগের সংখ্যা নয়; বরং সরকারি অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, তদন্তের সুপারিশের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিতে দায়িত্ব ও জবাবদিহির চূড়ান্ত অবস্থান কী—তার উত্তর পাওয়া।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে প্রথমে মোস্তাক আহমেদ কিছু বলতে রাজি হননি। পরে তিনি বলেন, অলরেডি আমাকে আমার প্রতিষ্ঠান এই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। দুদকের তদন্ত চলমান রয়েছে। আশা করি সেখান থেকেও আমরা অব্যাহতি পাবো। কারণ উদ্দেশ্যপ্রণীতভাবে আমার বিরুদ্ধে এই রকম অভিযোগ আনা হয়েছে। যার সঙ্গে আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই।