logo

যশোরে সার ডিলার নিয়োগে ১০–২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ, তদন্তে প্রশাসন

সোহেলী চৌধুরী

Published:25 Oct 2026, 08:21 PM

যশোরে সার ডিলার নিয়োগে ১০–২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ, তদন্তে প্রশাসন

যশোরে সার ডিলার নিয়োগে ১০–২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ, তদন্তে প্রশাসন

যশোরের ৯৩টি ইউনিয়ন ও আটটি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগ ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব, আর্থিক লেনদেন এবং যোগ্য ব্যবসায়ীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ডিলারশিপ পেতে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া বাকি।

২২ অক্টোবর যশোর প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিলের দাবি জানানো হয়। তাঁদের অভিযোগ, প্রকৃত সার ব্যবসায়ী ও কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপেক্ষা করে রাজনৈতিক পরিচয় এবং অবৈধ লেনদেনের ভিত্তিতে কিছু ডিলারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রছুল। তিনি অভিযোগ করেন, পাঁচ সংসদ সদস্যের মতামত বা সুপারিশ ছাড়াই জেলা প্রশাসক ডিলারদের তালিকা চূড়ান্ত করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিতে সংসদ সদস্যদের পরামর্শ উপেক্ষা করে জেলা ও উপজেলা বিএনপির সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও তোলেন তিনি।

গোলাম রছুলের দাবি, মণিরামপুর পৌরসভায় নাফিজ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মাসুদ পারভেজ রুবেল ডিলারশিপ পেয়েছেন। তিনি উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির ছেলে বলে উল্লেখ করেন গোলাম রছুল। শ্যামকুড় ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সালাউদ্দীন, নেহালপুর ইউনিয়নে ‘অনু’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি এবং দরাজহাট ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্য ফয়সালও ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে তাঁর অভিযোগ।

এ ছাড়া বাঘারপাড়া, চৌগাছা ও শার্শার বিভিন্ন এলাকায় ডিলার হিসেবে মনোনীত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয়, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন বাঘারপাড়ার বাসুয়াড়ী ইউনিয়নের হাবিবুর রহমান, যিনি মেসার্স হাবিবুর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী; দোহাকুলার আব্দুর রশিদ; চৌগাছার সুখপুকুরিয়ার শ্যামল কুমার বিশ্বাস, ধুলিয়ানীর রনজু বেগম ও জগদীশপুরের ইমরাক আব্বি আসাদ এবং শার্শার ডিহি ইউনিয়নের রফিকুল ইসলাম, যিনি নিউ সততা ট্রেডার্সের সঙ্গে যুক্ত।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও গুদামের ব্যবস্থা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বাঘারপাড়ায় ২৮ বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যের গাড়িচালকের ভাইকে ডিলার নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে, চৌগাছায় শ্যামল কুমার বিশ্বাসের ছেলে কনক বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ৯০০ পিস ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তারের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ধুলিয়ানীতে খাইরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২৭৮ বস্তা চোরাই সার ও ৩৮ বস্তা অবৈধ সার পাচারের ঘটনায় আটকের অভিযোগও তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী রনজু বেগমের নামে ৩০ দিনের মধ্যে ডিলারশিপ অনুমোদনের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পুলিশি নথি, নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং প্রযোজ্য নীতিমালা যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বক্তব্যও নেওয়া জরুরি।

ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন। তাঁর ভাষ্য, অভিযোগগুলো বাস্তবতাবিবর্জিত। আবেদন যাচাই ও মাঠপর্যায়ে নিরীক্ষার দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের ছিল এবং নীতিমালা অনুসরণ করেই তালিকা পাঠানো হয়েছে।

চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক গোবিন্দ কুমার রাহাও ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে ২০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে, বাঘারপাড়া উপজেলার খলশী ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও সার ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সাত্তার দাবি করেছেন, ২৮ বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ডিলারশিপ পাননি। শার্শা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম আব্দুল হকও এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন দিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রফিকুল হাসান কমিটির আহ্বায়ক। অন্য দুই সদস্য হলেন যশোরের পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি হিসেবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক।

রফিকুল হাসান জানিয়েছেন, ডিলারদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, ব্যাংক সচ্ছলতা, গুদামের অস্তিত্ব এবং আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সরেজমিনে যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আবেদনকারীর ব্যাংক হিসাবে ন্যূনতম পাঁচ লাখ টাকা, উপযুক্ত গুদাম এবং পূর্ববর্তী ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার মতো বিষয় বিবেচনার কথা রয়েছে।

গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অযোগ্যতা, একই পরিবারের একাধিক সদস্যের ডিলারশিপ পাওয়া এবং জেলা ও উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির গঠনসংক্রান্ত বিধান নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে নিয়োগের সময় কার্যকর নীতিমালার সঠিক ধারা ও নির্দেশনা যাচাই না করে কোনো নিয়োগকে সরাসরি বিধিবহির্ভূত বলা যায় না।

ডিলার নিয়োগের পাশাপাশি কৃষকের কাছে সার বিক্রির মূল্য নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ইউরিয়ার সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপির ১ হাজার ৫০ টাকা, টিএসপির ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং এমওপির ১ হাজার টাকা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, কৃষকের কাছ থেকে ইউরিয়া ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা এবং এমওপি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। সে হিসাবে প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগ ইউরিয়ায় ১৫০–৩০০ টাকা, ডিএপিতে ৭৫০–১ হাজার ১৫০ টাকা, টিএসপিতে ৪৫০–৬৫০ টাকা এবং এমওপিতে ২০০–৪০০ টাকা।

তবে সরকারি মূল্যতালিকা, কৃষকের ক্রয়রসিদ এবং বাজার পরিদর্শনের তথ্য দিয়ে এসব অভিযোগ যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

কিছু নতুন ডিলারের গুদাম ও বিক্রয়কেন্দ্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি বরাদ্দের সার খোলাবাজারে চলে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় সার চোরাচালানের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

এসব অভিযোগ যাচাইয়ে গুদাম পরিদর্শন প্রতিবেদন, বরাদ্দ ও সার উত্তোলনের হিসাব, পরিবহন চালান, বিক্রির রেজিস্টার এবং কৃষকদের কাছ থেকে নেওয়া দামের তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ), সার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাপনার ভূমিকা নিয়েও উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর নথিপত্রের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা দরকার।

যশোরে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে। নিয়োগপ্রাপ্তরা নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছেন কি না, অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ রয়েছে কি না এবং কৃষকেরা সরকারি নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন কি না—এসব বিষয় তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। 

অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের সত্যতা না মিললে সংশ্লিষ্টদের অবস্থান পরিষ্কার করাই হবে স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

পিপলসনিউজি/এস.সি 

© ঠাকুরগাঁও ৭১

সম্পাদকঃ ফইজুল ইসলাম উপদেষ্টা: অধ্যক্ষ (ভাঃপ্রাঃ), মো: মাজহারুল ইসলাম সুজন, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, ঠাকুরগাঁও জেলা।

ফোন : +৮৮০১৭১৭৮০১৪৪০, ইমেইল : info@thakurgaon71.com