নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর হাতে বিনা মূল্যে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের মুদ্রণ ও সরবরাহ কার্যক্রম শুরু করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। লক্ষ্য, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে বই পৌঁছানো। কিন্তু মুদ্রণের ধীরগতি, দরপত্রে সীমিত প্রতিযোগিতা, নিম্নমানের বই এবং ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ে বিতর্কিত প্রতীক পুনরায় যুক্ত হওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে-নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ কতটা সম্ভব, আর সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় নেবে কে?
এনসিটিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত মোট ৩০ কোটি ৭৭ লাখ ৯৮ হাজার ১০১টি বই ছাপার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ৬২৩টি লটে ১১৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি থেকে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। কিন্তু অক্টোবরের শেষভাগে মোট বইয়ের ৬১ দশমিক ৭৮ শতাংশ মুদ্রিত হলেও প্রাক-সরবরাহ পরিদর্শন বা পিডিআই অনুমোদন পেয়েছে মাত্র ৪২ দশমিক ৪১ শতাংশ। মাধ্যমিক স্তরে মুদ্রণ অগ্রগতি ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ হলেও পিডিআই অনুমোদনের হার মাত্র ২৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
বিশেষ করে নবম ও দশম শ্রেণির বইয়ের সরবরাহ অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় ৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ৩ নভেম্বরের মধ্যে অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির ৫০ শতাংশ বই উপজেলায় পাঠানোর বাধ্যবাধকতা থাকলে তা কতটি প্রতিষ্ঠান পূরণ করতে পেরেছে? যেসব প্রেস এখনো উৎপাদন শুরু করতে পারেনি, তাদের সক্ষমতা যাচাই করেই কি কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল? আর যাচাই করা হয়ে থাকলে উৎপাদনের এই ধীরগতির দায় কার?
দরপত্রে সিন্ডিকেটের অভিযোগ, সাশ্রয়ের হিসাব কোথায়? মূল দরপত্রের ৪৫টি লটের মধ্যে ৩০টিতে একক দরদাতা, ১৩টিতে দুজন এবং মাত্র দুটি লটে তিনজন দরদাতা অংশ নিয়েছিলেন বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ, প্রাক্কলিত গোপন দর ফাঁস এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের মধ্যে কাজ ভাগাভাগির মাধ্যমে প্রতিযোগিতা সীমিত করা হয়েছিল। এমনকি একটি পরিবারের চারটি ছাপাখানাকে মোট কাজের প্রায় ২৫ শতাংশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
একক দরদাতা থাকলেই অনিয়ম প্রমাণিত হয় না। তবে দরপত্রের নথি, ই-জিপি রেকর্ড ও মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত যাচাই করে প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার কারণ প্রকাশ করা জরুরি। এনসিটিবির কাছে প্রশ্ন, গোপন দর ফাঁসের অভিযোগ তদন্তে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কোথায়?
পুনঃদরপত্রের ফলাফল এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে। বাতিল হওয়া ৩৪টি লটে প্রাক্কলিত ব্যয় ৬৭ কোটি ৩ লাখ টাকার বিপরীতে প্রস্তাবিত দর ছিল ৫৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা—সম্ভাব্য সাশ্রয় ৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। চারটি নতুন বইয়ের ২৩টি লটে প্রাক্কলিত ৫৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকার বিপরীতে প্রস্তাবিত দর ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সম্মিলিতভাবে সাশ্রয়ের অঙ্ক ১৪ কোটি টাকার বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনসিটিবির কর্মকর্তাদের গাণিতিক বিশ্লেষণের বরাতে দাবি করা হয়েছে, মূল দরপত্রে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হলে শুধু মাধ্যমিকের বই মুদ্রণেই প্রায় ২৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা সাশ্রয় সম্ভব হতো। যদিও এই হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন, তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—পুনঃদরপত্রে কম দরে কাজ দেওয়া সম্ভব হলে শুরুতেই প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা হলো না কেন? ৬ অক্টোবর ২০২৬ দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে এনসিটিবির দরপত্র-সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহের পর তদন্তের অগ্রগতি কী? নিম্নমানের বই ও বিতর্কিত প্রতীক, জবাবদিহি কোথায়?
নির্ধারিত মান পূরণ না করায় ৩৬টি প্রেসের প্রায় সাড়ে ৯ লাখ থেকে ১০ লাখ নিম্নমানের ফর্মা এবং ১২ হাজারের বেশি ত্রুটিপূর্ণ বই বাজেয়াপ্ত বা বিনষ্ট করা হয়েছে বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। প্রাথমিক স্তরের আরও ৩ হাজার ৩৩৪টি বইয়ে ত্রুটি পাওয়া গেছে। কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা ও বাঁধাই যাচাইয়ের দায়িত্ব যাদের, তারা উৎপাদনের কোন পর্যায়ে এসব ত্রুটি শনাক্ত করেছিলেন?
পরিদর্শন সংস্থার সঙ্গে প্রেস মালিকদের যোগসাজশের অভিযোগ থাকলে তার প্রমাণ ও তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন? এর মধ্যেই ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের ‘জ্ঞানের পিরামিড’ চিত্রে ‘প্রজ্ঞা’ বোঝাতে একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রতীকের ছবি পুনরায় যুক্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের সংস্করণে ছবিটি পরিবর্তন করা হলেও ২০২৭ সালের বইয়ে পুরোনো ছবি কীভাবে ফিরে এল? চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি কে অনুমোদন করেছেন, আর মুদ্রণের আগে নমুনা কপি যাচাইয়ের ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি না?
বইটির লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৩৮ লাখ কপি। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ থেকে ৩০ লাখ বই ছাপা ও বাঁধাই শেষে উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছানোর পর প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। সংশোধিত পাতা পুনর্মুদ্রণ ও প্রতিস্থাপনে প্রায় ১৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। এই ব্যয়ের হিসাব, প্রত্যাহার করা বইয়ের প্রকৃত সংখ্যা এবং ভুলের জন্য দায়ী পক্ষ নির্ধারণে নথিভিত্তিক তদন্ত জরুরি। ভুলটি অনিচ্ছাকৃত হলে একাধিক যাচাই ধাপেও তা ধরা পড়ল না কেন? আর ছাপাখানা অনুমোদিত নকশা অমান্য করে থাকলে চুক্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি?
২৫ অক্টোবর ২০২৬ চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ‘খেলাধুলা’, ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’ নামে চারটি নতুন বই অনুমোদনের তথ্যও পরিকল্পনার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষাবর্ষ শুরুর এত কাছাকাছি সময়ে অনুমোদন দেওয়ায় মুদ্রণ ও সরবরাহের সময়সূচিতে কী প্রভাব পড়েছে, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
দেশীয় প্রেস ব্যর্থ, নাকি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি? ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মানসম্মত বই সরবরাহে ব্যর্থ হলে কার্যাদেশ বাতিলের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। দেশীয় প্রেস ব্যর্থ হলে চীন থেকে বই ছাপানোর বিকল্পের কথাও বলা হয়েছে। বিপরীতে মুদ্রণশিল্পের প্রতিনিধিদের দাবি, শিল্পের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দরপত্র বিলম্ব ও কাজ বণ্টনের অনিয়ম সংকট বাড়িয়েছে।
তাহলে কোন প্রতিষ্ঠান কত বই ছাপানোর দায়িত্ব পেয়েছে, কতটুকু কাজ শেষ করেছে এবং বিলম্বের কারণ কী-এনসিটিবি কি সেই তথ্য প্রকাশ করবে? প্রতিষ্ঠান চুক্তিভঙ্গ করলে ব্যবস্থা নিতে হবে; আর প্রশাসনিক বিলম্ব দায়ী হলে সেই দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। বিদেশে মুদ্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যয়, মান, পরিবহন ও দেশীয় শিল্পের কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব যাচাই করাও জরুরি।
সার্বিক অগ্রগতি, দরপত্রের স্বচ্ছতা, বইয়ের মান এবং সংশোধনজনিত অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ না করলে ৩০ নভেম্বরের লক্ষ্যমাত্রা কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা থেকেই যাবে। প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাবর্ষ কোনো সিন্ডিকেট, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা পরিকল্পনাহীনতার কাছে জিম্মি থাকতে পারে না।
শেষ প্রশ্ন-৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি কি বাস্তব উৎপাদন ও সরবরাহের হিসাবের ওপর দাঁড়িয়ে, নাকি আবারও শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বই না পৌঁছানোর দায় আড়াল করবে একটি প্রশাসনিক ঘোষণা?
পিপলসনিউজ/এস.সি