দ্বিতীয় বিয়ে করতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি, ইসলামে কী আছে
প্রকাশ : ১৩-০১-২০২৬ ১২:২৫
ছবি : সংগৃহীত
পিপলসনিউজ ডেস্ক
বিয়ে মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জীবনের অপরিহার্য চাহিদা পূরণের জন্য অপরিসীম ভূমিকা রাখে বিয়ে। পরিণয় ছাড়া জীবন অনেক সময় নিষ্ক্রিয় ও অসার হয়ে পড়ে। জীবনের শৃঙ্খলা ও পূর্ণতা আনতে বিয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। বিয়েবিহীন জীবনে কিছু প্রয়োজন অপূর্ণই থেকে যায়।
বিয়ে বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর অগণন অনুগ্রহের একটি। আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য হতে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গীণীকে, যাতে তোমরা তাদের নিকট শান্তি লাভ করতে পার ও তোমাদের (স্বামী-স্ত্রীর) পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে বহু নিদর্শন রয়েছে, সেইসব লোকের জন্য, যারা চিন্তা-ভাবনা করে। (সুরা: রূম, আয়াত ২১)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, তিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন। তার থেকেই তার স্ত্রীকে বানিয়েছেন, যাতে সে তার নিকট প্রশান্তি লাভ করতে পারে। (সুরা: আরাফ, আয়াত ১৮৯)
একাধিক বিয়ের বিষয়ে কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা বিবাহ করবে নারীদের মধ্যে যাকে তোমার ভালো লাগে দুই, তিন অথবা চার। আর যদি আশঙ্কা করো যে সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে একজনকে (বিয়ে করো)।’ (সুরা: নিসা, আয়াত ৩)
সুবিচার, ভরণপোষণের শক্তি-সামর্থ থাকলে ইসলাম একাধিক বিয়ের অনুমতি দেয়। তবে এখানে প্রশ্ন হলো দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি কি জরুরি? না জরুরি নয়।
রাজধানীর আফতাবনগরের আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া ইদারাতুল উলূম মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল মুফতি মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘শরয়ি কারণ পাওয়া গেলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে। শরয়ি কারণ হলো, প্রথম স্ত্রী অবাধ্য, শারীরিক সম্পর্ক করতে পারছে না, প্রথম স্ত্রী অনেক অসুস্থ, যার কারণে স্বামীর গুনাহ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, প্রথম স্ত্রী লাগামহীন, তখন অবশ্যই একজন আলেমের শরণাপন্ন হবে। তার অবস্থা জানাবে, আলেমের পরামর্শ নিয়ে অন্য বিয়ে করবে। আর প্রথম স্ত্রীর কোনো ধরনের সমস্যা না থাকলে, শরয়ি কোনো ওজর না থাকলে তারজন্য একাধিক বিয়ে করা জায়েজই নাই। কারণ প্রথম স্ত্রীর সমস্যা থাকলেই একাধিক বিয়ে করতে পারবে, যদি তাদের প্রতি বৈষম্যহীনভাবে পরিচালনা করতে পারে। এটাই কোরআনের নির্দেশ। প্রথম স্ত্রীর কোনো সমস্যা না থাকলে, তখন দ্বিতীয় বিয়ে করতে গেলেই অশান্তি সৃষ্টি হয়। এখানেই বৈষম্যগুলো দেখা দেয়। এটা কোরআনের নির্দেশ না।’
প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলেও বিয়ে হয়ে যাবে। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, ইসলাম একাধিক বিয়ের অনুমতি তখনি প্রদান করেছে, যখন উভয় স্ত্রীর হক সমানভাবে, কোনো প্রকার বৈষম্য ছাড়া আদায় করতে পারবে, তখন। সাম্যতা বজায় রাখতে না পারলে, কিংবা হক আদায় করতে না পারলে দ্বিতীয় বিবাহ করা জায়েজ নয়।
যদিও অনুমতি ছাড়াই বিয়ে শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নেওয়াই বাঞ্ছনীয়। যেহেতু স্ত্রীকে খুশি রাখাও স্বামীর একটি দায়িত্ব। নবীজী এ বিষয়ে খুবই গুরুত্ব প্রদান করেছেন।
হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন, আমার নিকট হতে নারীদের সঙ্গে সদাচরণের উপদেশ গ্রহণ কর। তাদেরকে পাঁজরের হাড় দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। হাড়ের মধ্যে সর্বাধিক বাঁকা হাড় হলো উপরেরটি। (সেই হাড় হতেই নারীদের সৃষ্টি করা হয়েছে)। অতএব তুমি যদি তা সোজা করতে চাও তবে ভেঙে ফেলবে। আর ওইভাবে ফেলে রাখলে সর্বদা উহা বাঁকাই থাকবে; সুতরাং তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। (বুখারি, হাদিস ৫১৮৬)
ইসলাম দ্বিতীয় বিয়ে বা বহু বিবাহে উৎসাহিত করে তখনই যখন সব দিক দিয়ে শান্তি বজায় রেখে, প্রথম স্ত্রীর খুশি মতে বিয়ে করতে পারবে। কোরআনের ভাষায় অবশ্যই সমতা বজায় রাখতে হবে। দ্বিতীয় বিয়ে করে প্রথমজনকে অবহেলিত অবস্থায় রেখে যাওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। আর ভরণপোষণ দিতে না পারলে তো দ্বিতীয় বিয়েতে যেতেই পারবে না।
হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন, মুমিনদের মধ্যে পূর্ণতর মুমিন সেই ব্যক্তি, যার আচার আচারণ উত্তম। আর তোমাদের মাঝে উত্তম সেই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীদের কাছে উত্তম। (ইবনে হিব্বান, হাদিস ৪১৭৬)
হজরত আয়শা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন, মুমিনদের মাঝে সেই ব্যক্তি অধিকতর পূর্ণ মুমিন, যে ব্যক্তি সদাচারী এবং নিজ পরিবারের জন্য কোমল এবং অনুগ্রহশীল। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৪২০৪, তিরমিজি, হাদিস ২৬১২)
হাদিসগুলো পর্যলোচনা করলে বুঝা যায়, দ্বিতীয় বিয়ের সময় প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়াটাই জরুরি। যেহেতু আমরা একটি সাংবিধানিক দেশে বসবাস করি। দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াও আমাদের কর্তব্য।
ঝিনাইদহ জজ কোর্টের আইনজীবী মুফতি ইলিয়াছ আলমগীর বলেন, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে ও তার ভরণপোষণ না দেওয়া একটি ফৌজদারি অপরাধ। এ ক্ষেত্রে আমরা মুসলিম পারিবারিক আইন ফলো করে থাকি।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৬ ধারামতে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিশি পরিষদের কাছে অনুমতি না নিলে বিয়ে নিবন্ধন হবে না। আর তাই প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে অবৈধ বলে গণ্য হবে।
এ অবস্থায় প্রতিকার পেতে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দণ্ডবিধি আইন-১৮৬০-এর ৪৯৪-এর বিধানমতে মামলা করতে পারবেন। এ সময় স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের কাবিননামা আদালতে দেখাতে হবে। অনুমতিহীন বিয়ের বিষয়ে স্বামীর অপরাধ প্রমাণিত হলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।
এ ছাড়া সন্তান থাকলে তার ভরণপোষণ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক আদালতে ভরণপোষণ চেয়ে মামলা করতে পারবে। সবগুলো আইনই মূলত পারিবারিক শান্তি রক্ষার জন্য করা হয়েছে। তবে কোরআনের বিধানের প্রতি অবশ্যই শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
পিপলসনিউজ/আরইউ
-- বিজ্ঞাপন --
CONTACT
ads@peoplenewsbd.com