সবজিতে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও বাকি নিত্যপণ্যের দামে নাখোশ ক্রেতারা
প্রকাশ :
ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে সরবরাহ বাড়ায় সবজির দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও আটা-ময়দা, মুরগি, ডিম, মাছ ও ভোজ্যতেলের চড়া দামে দিশাহারা নিম্ন এবং মধ্যবিত্ত ক্রেতারা।
আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় সাধারণ মানুষ খাবারের তালিকা থেকে আমিষ ছাঁটাই করছেন এবং রেস্তোরাঁয় খাওয়া বা বিনোদনমূলক খরচ কমিয়ে বাধ্য হয়ে জীবনযাত্রার মান সংকুচিত করছেন।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর একাধিক বাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব কথা জানা গেছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনন্দিন বাজারদরের তথ্যেও আটা-ময়দার দাম বাড়ার চিত্র রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, গত এক মাসে খোলা আটার দাম কেজিতে তিন টাকা এবং খোলা ও মোড়কজাত ময়দার দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়েছে।
তবে খুচরা বাজারে দাম বেড়েছে আরও বেশি। রাজধানীর তিন বাজারের মুদিদোকানগুলোয় প্রতি কেজি খোলা আটা ৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এক মাস আগে যা ছিল ৪৫ টাকা। খোলা ময়দার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়। মাসখানেক আগে এ দাম ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা।
বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোড়কজাত ময়দার দামও বেড়েছে। বর্তমানে দুই কেজির এক প্যাকেট ময়দা ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কেজিপ্রতি দাম পড়ছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা। এক মাস আগে এক কেজি মোড়কজাত ময়দা বিক্রি হয়েছে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায়।
কারওয়ান বাজারের মুদি দোকানি খাইরুল শিকদার বলেন, ‘আগে ৫০ কেজির এক বস্তা ময়দা দুই হাজার ৫০০ টাকায় কিনেছি। গত সপ্তাহে দাম বেড়ে হয়েছে দুই হাজার ৮০০ টাকা। পাইকারি ও ডিলার পর্যায়ে আটা-ময়দার দাম বেড়েছে। ফলে আমাকেও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’
এদিকে আটা-ময়দাসহ অন্যান্য কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে সম্প্রতি বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। পরে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ী নেতাদের বৈঠকে বেকারি পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের খরচ যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর রুটি ও বিস্কুটের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
বাজারে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দামও বাড়তি। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেড় মাস আগে এর দাম কেজিতে প্রায় ২০ টাকা কম ছিল। এর আগে অবশ্য ব্রয়লারের দাম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা কেজিতেও নেমেছিল।
ফার্মের বাদামি রঙের ডিমের এক ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। সাদা ডিম পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১০ টাকা কমে। এ ছাড়া সোনালি মুরগি প্রতি কেজি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা এবং হাইব্রিড বা কালারবার্ড সোনালি ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতাদের দাবি, গত কয়েক মাসে বন্যা, অতিবৃষ্টি ও অতিরিক্ত গরমের কারণে অনেক খামারে ডিম উৎপাদন এবং ব্রয়লার মুরগির সংখ্যা কমেছে। এতে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ায় মুরগি ও ডিমের দাম কমছে না।
মুরগি-ডিমের পাশাপাশি মাছের বাজারেও খুব একটা স্বস্তি নেই। পুকুরে চাষ করা মাছ পাঙাশ প্রতি কেজি ২৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৬০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। মানভেদে চিংড়ির কেজি ৮০০ থেকে ৯০০, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪৫০, বড় আকারের রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ ও ট্যাংরা ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ২৬০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে চাষের শিং মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে। মাঝারি আকারের রুই কেনা যাচ্ছে ২৭০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে। এ ছাড়া রূপচাঁদা, শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে গেলে হাজারের বেশি টাকা গুনতে হবে।
রাজধানীর খুচরা বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট এখনো কাটেনি। অনেক মুদি দোকানেই মিলছে না তেল। দু-এক দোকানে পাওয়া গেলেও সেগুলো শুধু দুই বা পাঁচ লিটারের বোতল। আধা লিটার ও এক লিটারের তেলের বোতল নেই বললেই চলে।
খুচরা বিক্রেতা ও তেলের পাইকারি সরবরাহকারীরা বলছেন, সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। তারপরও তারা সরবরাহ স্বাভাবিক করেনি। মূলত ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজারে কম ছাড়ছে।
বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে বোতলজাত সয়াবিনের তীব্র সংকট হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। ক্রেতা ধরতে অনেক বিক্রেতা এখন খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি শুরু করেছেন।
তবে অন্যান্য নিত্যপণ্যের তুলনায় সবজির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। বিক্রেতারা জানান, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় সবজির দাম মোটামুটি আগের অবস্থায় রয়েছে। ফলে আটা-ময়দা, মুরগি, ডিম ও মাছের বাড়তি দামের মধ্যে সবজিই আপাতত তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
এর মধ্যে ঢ্যাঁড়স ও পটলের দাম কমে সপ্তাহ দু-এক আগে ৪০ থেকে ৫০ টাকায় গেলেও এখন আবার সবজিটি বিক্রি হচ্ছে বাজারভেদে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। শসা প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। দেশি লাউ বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে। লম্বা আকারের বেগুণের দামও বেড়েছে। মোটামুটি ভালো মানের এই জাতের বেগুণ কিনতে হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে। কচুর মুখি ৫৫ থেকে ৭০ টাকা, করলা ৭০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া, চিচিংগার দামও খানিকটা চড়া। এগুলো বাজারভেদে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে, বরবটির দাম বেশি চড়া। পণ্যটি ১০০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। ভালো মানের ঝিঙ্গা ও কাকরোল বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যে।
বাজারে এখন কাচা মরিচের দামও বেড়েছে। প্রতি কেজি কাচা মরিচ বাজারভেদে ১৪০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে।
রামপুরা এলাকায় ভাই ভাই স্টোরের দোকানি আফজাল হোসেন বলেন, পাঁচ লিটার তেল কিনলে এমনিই মানুষ ১০ টাকা কম দিতে চায়। এখন আমাদের মুনাফাই পাঁচ টাকা। অর্থাৎ, হাজার টাকা ইনভেস্ট করে লাভ হচ্ছে পাঁচ টাকা। তাও কোম্পানি তেল দিচ্ছে না। সবাইকে জিম্মি করে রেখেছে।
এদিকে, বোতলজাত তেলের এ সংকটে খোলা তেলের দাম হুহু করে বাড়ছে। প্রতি লিটার সয়াবিন এখন ২০৫-২০৮ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া, পাম তেল বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকা দরে।
রায়ের বাজারে মো. মাকসুদুন নবী নামে এক ক্রেতা বলেন, বাজারে মাছ, মুরগি ও মাংসের দাম আগের অবস্থাতেই রয়েছে, বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে আমাদের মতো মধ্যবিত্তের মাছ পাঙাশ ও তেলাপিয়া কিনতে ক্রেতাদের বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। মুরগি ও মাংসের দামেও উল্লেখযোগ্য কোনো কমতি নেই, আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে।
একই বাজারের মাছ বিক্রেতা মহিউদ্দিন বলেন, মাছের দাম ঠিক নাই। এখন একদর, বিকালে আরেক দর। মাছ বেশি আসলে দাম কমে, কম আসলে দাম বাড়ে। ক্রেতা, সরবরাহ ও আবহাওয়ার উপরও দাম অনেক সময় নির্ধারণ হয়।
মগবাজারের বাসিন্দা মতিউর রহমান বলেন, একসময় ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে বাইরে বের হওয়া, রেস্তোরাঁয় খাওয়া কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া একটি স্বাভাবিক বিনোদনের অংশ ছিল। এখন বাড়তি ব্যয়ের ভয়ে এসব থেকেও দূরে থাকতে হচ্ছে। পরিবার নিয়ে বাইরে বের হলেই যাতায়াত, খাবার ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হয়ে যায়। মাসের শেষদিকে সেই অর্থটুকুও বড় হয়ে দেখা দেয়। তাই আনন্দের মুহূর্তগুলোও কাটছে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে।
ভোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন কেনাকাটার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ও বিলাসিতার মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি হয়েছে। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, ঘরের সাজসজ্জা কিংবা অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কমিয়ে দিয়েছেন অনেকে। পুরোনো পণ্য যতদিন সম্ভব ব্যবহার করছেন।
বেসরকারি চাকরিজীবী রুহুল আমিন বলেন, আগে মাসে অন্তত একবার পরিবার নিয়ে বাইরে খেতে যেতাম। এখন সেটিও বন্ধ। পোশাক কেনাকাটা ঈদকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সন্তানদের আবদার থাকলেও সব পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পিপলসনিউজ/আরইউ