“আলাদিনের চেরাগ’’ রাজউকে : নকশা বাণিজ্য ও শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ
প্রকাশ : ১৫-০৫-২০২৬ ১৫:৫৯
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভবন। ফাইল ছবি।
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর একাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নকশা জালিয়াতির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগ উঠছে, রাজধানীর বহুতল ভবন নির্মাণ, নকশা অনুমোদন, পরিদর্শন ও আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তা প্রভাবশালী ডেভেলপার ও দালালচক্রের সঙ্গে যোগসাজশে গড়ে তুলেছেন বহুমাত্রিক দুর্নীতির নেটওয়ার্ক।
তথ্য বলছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ইতোমধ্যে কয়েকজন ইমারত পরিদর্শক, সহকারী অথরাইজড অফিসার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান জোরদার করেছে। বিভিন্ন মামলায় নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণে সহায়তা, অবৈধ আর্থিক লেনদেন, সরকারি নথি গায়েব এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, রাজউকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের মধ্যে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন, যারা ভবন মালিকদের প্রশাসনিক জটিলতা ও আইনি ভয়ের মধ্যে ফেলে আর্থিক সুবিধা আদায় করেন। অভিযোগ রয়েছে, নকশা অমান্যের অভিযোগ তুলে ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করা হয় এবং পরে সমঝোতার নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনেক ক্ষেত্রে ভবনের সামান্য অংশ ভাঙচুর করে “অ্যাকশন” দেখানো হলেও পরে ওই ভবনই পুনরায় অবৈধভাবে চালু রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট মহলের ভাষ্য, এটি মূলত “দর কষাকষির কৌশল”হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রশ্ন উঠছে, সীমিত বেতনের সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ কীভাবে অল্প কয়েক বছরে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বহুমূল্যের ফ্ল্যাট, প্লট ও বাণিজ্যিক সম্পদের মালিক হলেন।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান ও বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনায় অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্তদের নামে ও বেনামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সম্পদের সন্ধান মিলেছে। উত্তরা, মিরপুর, মহাখালী, আফতাবনগর ও পূর্বাচল এলাকায় একাধিক বহুতল ফ্ল্যাট, প্লট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তির সঙ্গে এসব কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। এছাড়া স্ত্রী, সন্তান ও নিকট আত্মীয়দের নামে ব্যাংক আমানত, এফডিআর এবং সঞ্চয়পত্রে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, “অনেক সম্পদ সরাসরি কর্মকর্তাদের নামে না থাকলেও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন বা সহযোগীদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
অভিযোগ রয়েছে, কিছু কর্মকর্তা ডেভেলপারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে মূল নকশা পরিবর্তন, ফাইল গায়েব অথবা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করেন। এতে আইনবহির্ভূত ভবনও অনুমোদনের সুযোগ পায়। ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ, ভাঙচুর বা মামলা করার ভয় দেখিয়ে “ম্যানেজ”করার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। অনেক মালিক অভিযোগ করেছেন, নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা ছাড়া ফাইল অগ্রসর হয় না।
সূত্র জানায়, গুরুত্বপূর্ণ নথি ও নকশা “হারিয়ে যাওয়া” বা সার্ভারে খুঁজে না পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। পরে সেই নথি “উদ্ধার”বা “সমাধান” করে দেওয়ার নামে অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় একাধিক দালাল ও প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও যুক্ত থাকতে পারে।
উচ্চ আদালতও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। হাইকোর্টে দায়ের হওয়া একাধিক রিট ও পর্যবেক্ষণে রাজউকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তথ্য বলছে, দুদক ইতোমধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দিয়েছে। পাশাপাশি বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংক হিসাব তলব এবং স্থাবর সম্পদের তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াও চলছে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি কেবল দুর্নীতির মামলা নয়; বরং মানি লন্ডারিং, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাষ্ট্রীয় নথি জালিয়াতির মতো গুরুতর অপরাধের আওতায়ও তদন্ত হতে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও নির্মাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজউকের এই অনিয়ম শুধু আর্থিক দুর্নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাজধানীর সামগ্রিক নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নকশা বহির্ভূত ভবন, অগ্নি নিরাপত্তাহীন স্থাপনা এবং জলাশয় ভরাটের মতো কর্মকাণ্ডের কারণে ঢাকা ক্রমেই একটি অনিরাপদ নগরীতে পরিণত হচ্ছে। বেইলি রোডসহ বিভিন্ন অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ঝুঁকির ঘটনার পরও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউক কর্তৃপক্ষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স”নীতির কথা জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মিলবে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রশ্ন উঠছে, বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ চললেও কেন কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি এবং কীভাবে একই ধরনের অনিয়ম ধারাবাহিকভাবে চলতে পেরেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান তদন্ত নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া না হলে রাজধানীর নির্মাণখাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির সংস্কৃতি আরও গভীর হতে পারে। রাজউককে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগগুলো এখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; বরং নগর শাসন, জবাবদিহি ও জননিরাপত্তার বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে।
পিপলসনিউজ/ জেএ
-- বিজ্ঞাপন --
CONTACT
ads@peoplenewsbd.com