weather ২৮.১৬ o সে. আদ্রতা ৭৪% , রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে এলপিজির দাম, বেড়েছে ৩২ দফা

প্রকাশ :

পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে এলপিজির দাম, বেড়েছে ৩২ দফা

ছবি : সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
পাঁচ বছরে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১ সালের এপ্রিলে ৯৭৫ টাকা থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের এপ্রিলে দাম বেড়ে দাঁড়ায়— এক হাজার ৯৪০ টাকা। অর্থাৎ ৯৬৫ টাকা বা প্রায় ৯৯ শতাংশ বৃদ্ধি। এই সময়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দফায় দফায় দাম বাড়ানোর পাশাপাশি কমিয়েছেও; তবে মাসভিত্তিক সমন্বয়ের পরও সামগ্রিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী থেকেছে এলপিজির দাম। 

সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম এক হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও বাস্তবে বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় দুই হাজার ১৫০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায়। 

ফলে একদিকে সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারদরের বড় ব্যবধান, অন্যদিকে কৃত্রিম সংকট ও অবৈধ মজুতের অভিযোগে চাপে পড়েছেন ভোক্তারা।

এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটররা অবশ্য দাবি করছেন, দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই এবং সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের আমদানি তথ্যও দেশে পর্যাপ্ত সরবরাহের কথা তুলে ধরছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত দামে বিক্রি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। 

একই সঙ্গে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি ও অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। 

কিন্তু ধারাবাহিক এসব উদ্যোগের পরও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—সরকার নির্ধারিত দামে আদৌ এলপিজি পাবেন কি না সাধারণ ভোক্তারা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিইআরসির নির্ধারিত দামে বাজারে পণ্য না পাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারির ঘাটতিই ভোক্তাদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।

২০২১ সালের ১২ এপ্রিল দেশে প্রথমবার বেসরকারি পর্যায়ের এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। তখন ১২ কেজি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৯৭৫ টাকা। এরপর বিশ্ববাজারের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে দাম পরিবর্তন করা হয়।

প্রথম বছরেই দাম কয়েক দফা ওঠানামা করে। ২০২১ সালের এপ্রিলের দাম ৯৭৫ টাকা থেকে মে ও জুনে দাম কমে ৯০৬ ও ৮৪২ টাকায় নেমেছিল। এরপর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচদফা দাম বাড়ে। ওই বছরের নভেম্বরের শেষে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় এক হাজার ৩১৩ টাকা। পরে ডিসেম্বরে এক দফায় ৮৫ টাকা কমিয়ে এক হাজার ২২৮ টাকা করা হয়।

২০২২ সালে দাম বাড়ে সাতদফা, আর দাম কমে পাঁচ বার। তবে বছর শেষে ডিসেম্বরে গিয়ে দাম দাঁড়ায় এক হাজার ২৯৭ টাকা আর পরের জানুয়ারিতে যা ছিল এক হাজার ১৭৪ টাকা। ২০২৩ সালেও সাতদফা বাড়ানোর বিপরীতে পাঁচদফা দাম কমানো হয়। ওই বছরের শুরুতে থাকা এক হাজার ২৩২ টাকা থেকে ডিসেম্বরের শেষে দাম দাঁড়ায় এক হাজার ৪০৪ টাকা। যদিও ওই বছর সবচেয়ে কম দাম ছিল জুন মাসে ৯৯৯ টাকা।

২০২৪ সালে সাত দফায় সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়। বছরের শুরুতে এক হাজার ৪৩৩ টাকা থেকে ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ৪৭৪ এবং মার্চে এক হাজার ৪৮২ টাকায় ওঠে। এরপর কয়েক দফা কমা-বাড়ার পর নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে দাম ছিল এক হাজার ৪৫৫ টাকা।

২০২৫ সালে দাম বাড়ানোর প্রবণতা তুলনামূলক কম ছিল। বছরজুড়ে দুই দফা বাড়ানোর বিপরীতে একাধিক দফায় দাম কমানো হয়। নভেম্বর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম কমে এক হাজার ২১৫ টাকায় নেমেছিল। আর সর্বোচ্চ দাম ছিল ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ৪৭৮ টাকা।

চলতি বছরের (২০২৬) প্রথম চার মাসে আবারও এলপিজির দামে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। জানুয়ারিতে এক হাজার ২৫৩ টাকা থেকে ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ৩৫৬ টাকা করা হয়। পরে ভ্যাট কমানোর কারণে ১৫ টাকা কমে দাম দাঁড়ায় এক হাজার ৩৪১ টাকা। মার্চে দাম অপরিবর্তিত ছিল। এরপর এপ্রিলে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা বাড়ানো হয়। প্রথম দফায় ৩৮৭ টাকা এবং দ্বিতীয় দফায় ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৯৪০ টাকায় নির্ধারণ করা হয়।

অর্থাৎ ২০২১ সালের এপ্রিলে ১২ কেজি এলপিজির দাম ছিল ৯৭৫ টাকা; যা ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে দাঁড়ায় এক হাজার ৯৪০ টাকা। দেখা যাচ্ছে, পাঁচ বছরে দাম বেড়েছে ৯৬৫ টাকা, যা প্রায় ৯৯ শতাংশ।

চলতি বছরের এপ্রিলের পর আগস্টে এক দফায় ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৭০ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৫৯৮ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি। তবে এর আগে জুনে ৫৫ টাকা এবং জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানো হয়। সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে আরও ১৩ টাকা কমিয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভোগান্তি বনাম সরকার ও মালিকদের উদ্যোগ: বিইআরসি দফায় দফায় এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে বাজারে এই দামে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। বরং নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক  বেশি দামে সিলিন্ডার কিনে থাকেন গ্রাহকরা।

সবশেষ সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজির যে সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি, বাজারে সেই সিলিন্ডার এক হাজার ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার ৫০০ টাকা  দরে বিক্রি হচ্ছে। একদিকে সংকটের দোহাই দিচ্ছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। যদিও এলপিজি মালিকরা ২৮ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে দেখা করে ‘দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই’ বলে নিশ্চিত করেছেন।

ওই সভায় দেশের এলপিজি খাতের সার্বিক চিত্র উপস্থাপন ও পর্যালোচনা করা হয়। এনবিআরের সূত্র হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, গত আগস্ট ২০২৬ মাসে এক লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন এবং চলতি সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাসে (২২ তারিখ পর্যন্ত) এক লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। প্রদর্শিত উপাত্ত অনুযায়ী, দেশে এলপিজির জোগান ও মজুত পরিস্থিতি ভালো। সুতরাং বর্তমানে এলপি গ্যাসের কোনো ধরনের সংকট নেই  বলে সভায় জানান এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটররা। 

এরপর গত ৩০ সেপ্টেম্বর দেশের কোথাও এলপিজির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশ দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী। সচিবালয়ে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত অনলাইন বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন।

মন্ত্রী বলেন, দেশে এলপিজির সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তবে কিছু এলাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা হতে পারে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও কোথাও কেন সংকটের কথা শোনা যাচ্ছে এবং কেন অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখে তথ্য ও প্রমাণসহ প্রতিবেদন পাঠাতে ডিসিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ১ অক্টোবর দেশে এলপিজির সরবরাহ পর্যাপ্ত ও সন্তোষজনক রয়েছে বলে জানিয়েছে লোয়াব। পর্যাপ্ত সরবরাহের পরও বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি বা অবৈধ মজুত করা হলে সরকারের কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে সংগঠনটি।

পর পর এতগুলোর উদ্যোগের পর এলপিজির দাম সাধারণ মানুষ সরকার নির্ধারিত দামে পাবে কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, যে হারে দাম বাড়ানো হচ্ছে, তাতে ভোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে তা সামাল দেওয়া খুব কঠিন হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, বিইআরসির নির্ধারিত দামে কোথাও বাজারে এলপিজি বিক্রি হয় না। ফলে ভোক্তাদের আরও বেশি দামে কিনতে হয়।

তিনি বলেন, এলপিজি খাতে অনিয়ম প্রতিরোধের দায়িত্ব বিইআরসি, প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিদপ্তর ও বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অসাধু ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। দরকার হলে আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে নতুন করে লাইসেন্স দিতে হবে। এলপিজি ব্যবসা কারও ব্যক্তিগত বা পৈতৃক সম্পত্তি নয় যে, ইচ্ছামতো দাম বাড়াবে এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে না।

লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক এলপিজি বেশি দামে রাখা প্রসঙ্গে বলেন, আমদানি কমেনি। খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতাদের কারণে সমস্যা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। কোনো অপারেটর বেশি দামে বিক্রি করছে– এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

সর্বশেষ খবরে দেশে এলপিজি গ্যাসের সরবরাহ সংকট ও বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগের মধ্যেই আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। শনিবার দুপুরে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে এ বৈঠক করেন তিনি। এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির উপস্থিত ছিলেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। তবে সভায় কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

পিপলসনিউজ/আরইউ

-- বিজ্ঞাপন --


CONTACT

ads@peoplenewsbd.com

পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে এলপিজির দাম, বেড়েছে ৩২ দফা পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে এলপিজির দাম, বেড়েছে ৩২ দফা হামের উপসর্গে আট মৃত্যু, ডেঙ্গুতে ছয় জনের হামের উপসর্গে আট মৃত্যু, ডেঙ্গুতে ছয় জনের বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু আবারও বাড়ছে: ডব্লিউএইচও বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু আবারও বাড়ছে: ডব্লিউএইচও শেখ হাসিনার ঘটনায় ভারত প্রস্তুত ছিল না: দীনেশ ত্রিবেদী শেখ হাসিনার ঘটনায় ভারত প্রস্তুত ছিল না: দীনেশ ত্রিবেদী বিমানবন্দরের ঘটনায় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান এক দিনের রিমান্ডে বিমানবন্দরের ঘটনায় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান এক দিনের রিমান্ডে