হামের উপসর্গে ৬ জনের মৃত্যু, ডেঙ্গুতে ৮
প্রকাশ :
ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়, অর্থাৎ মঙ্গলবার সকাল থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত হাম ও উপসর্গে ছয়জন মারা গেছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে আটজনের। বুধবার (৭ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম ও ডেঙ্গুবিষয়ক পৃথক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে দুই কোটি শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছে; আগামী মাসে আরও প্রায় ৩৫ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
অন্যদিকে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সব ধরনের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করলেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ নাকচ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে জানা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে মারা গেছে ১ হাজার ৩৬ জন। আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু ১০৪ জনের। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৪০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নিয়মিত এই পরিসংখ্যানে বয়সভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায় না। রোগতত্ত্ববিদরা বলছেন, হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে, তবে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়। প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে যত মৃত্যু হচ্ছে, তার সবই হামে মৃত্যু বলে বিবেচনা করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ১ হাজার ২৮০ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ২৯৩।
তথ্যমতে, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্তের সংখ্যা ১১০। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ২২ হাজার ২০ রোগীর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬৭৬ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৪৭৩ জন।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে সবচেয়ে বেশি রোগী মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে ২ জন করে হাম ও উপসর্গে মারা গেছে। বাকি দুজন উপসর্গে মারা গেছেন চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে।
চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশের হামের প্রকোপ শুরু হয়। তবে সে সময় সরকার এদিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি। তখনকার অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে হামের টিকা নিয়ে অবহেলা দেখায়। চলতি বছরে দেশের ইতিহাসে হামে রেকর্ড মৃত্যু এবং সংক্রমণের পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের এই অবহেলাকে প্রধান কারণ হিসেবে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।
মার্চ মাস থেকে হামের প্রকোপ বাড়তে শুরু করলে টিকা দান এবং চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ আছে। এপ্রিল মাসে সরকার গণটিকা দেওয়া শুরু করে। কিন্তু সেই কর্মসূচিতে অন্তত ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে যায়। বর্তমানে হামের ভয়ানক প্রকোপ বৃদ্ধির মূলে বড় কারণ এই ভুল।
আগামী মাসে ৩৫ লাখ শিশুকে দেওয়া হবে হামের টিকা-স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী : হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে ইতোমধ্যে দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত। তিনি বলেছেন, আগামী এক মাসে আরও প্রায় ৩৫ লাখ শিশুকে এই টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
বুধবার হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলো মোকাবিলায় নতুন সরকারের নেতৃত্বে কাজ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচনি প্রচারণা ও নির্বাচনি ইশতেহারে দেশের কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে জনগণের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সরকার, গ্যাভি, ইউনিসেফ এবং বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী ও মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সহযোগিতা করছেন।
হাম প্রতিরোধে সরকারের নেয়া কার্যক্রম তুলে ধরে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার ১৫ দিন পর থেকেই সরকার যে লড়াই শুরু করেছে, তার অগ্রগতি ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও সরকার সেখানে থেমে থাকেনি। কারণ প্রতিটি শিশুর জীবন মূল্যবান। একটি শিশুও যেন টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ না পড়ে, সেটিই সরকারের লক্ষ্য। এ কারণেই এবারের কর্মসূচিকে ‘মপ-আপ ক্যাম্পেইন’ হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকায় থাকা শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং আগের ধাপের টিকাদান কর্মসূচি থেকে কোনো কারণে বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকা দেয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব শিশুর প্রতিটি ঘরে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে। প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছে তাদের নিরাপত্তা ও জীবন নিশ্চিত করাই এই কর্মসূচির লক্ষ্য।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি বাংলাদেশের জনগণের কাছে সরকারের অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আগামী এক মাসের মধ্যে আরও প্রায় ৩৫ লাখ শিশুকে এই টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, সবার সহযোগিতা ছাড়া এই কর্মসূচি সফল করা সম্ভব হতো না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার, গ্যাভি ও ইউনিসেফ সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মী, সিটি কর্পোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সবাই অনেক কষ্ট করে কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি শিশুকে খুঁজে বের করছেন।
তিনি বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কিংবা প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে বসবাসকারী শিশুর কাছেও টিকাদান কর্মসূচির আওতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। এটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
তিনি আরও বলেন, যত বাধা বা চ্যালেঞ্জই আসুক না কেন, সরকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এবং দেশি-বিদেশি সব প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গে নিয়ে জনগণের স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। স্বাস্থ্যের বিষয়ে জনগণের কাছে যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
ডেঙ্গুতে আরও ৮ জনের মৃত্যু : গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৮ জন। এই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৮৬০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ২৮৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯২ হাজার ২১৬ জন।
২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়াদের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের দুজন করে এবং বরিশাল ও সিলেট বিভাগের একজন করে মোট ৮ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে খুলনা বিভাগে ৩৭৬, ঢাকা বিভাগে ৩৪৭, চট্টগ্রামে ২১৬, ঢাকা উত্তর সিটিতে ২১২, বরিশাল বিভাগে ২০০, রাজশাহী বিভাগের ১৭৬, ঢাকা দক্ষিণে ১৭১, ময়মনসিংহে ১১০, রংপুরে ৩৮ এবং সিলেটে ১৪ জন রয়েছেন।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার ব্যর্থ, এটা ঠিক না-স্বাস্থ্যমন্ত্রী : ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ব্যর্থ, এমনটি মনে করেন না স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর জন্য যা যা করণীয়, সব ধরনের চেষ্টা করছে সরকার। স্যালাইনসহ সব ধরনের চিকিৎসা চলছে হাসপাতালগুলোতে। প্রটোকল অনুযায়ী যা করণীয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সব করা হচ্ছে। তাই ডেঙ্গু চিকিৎসায় সরকার ব্যর্থ, এটা সঠিক নয়।
সচিবালয়ে বুধবার নিজ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কথা বলছিলেন তিনি। আগামী ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে বছরব্যাপী পরিবার পরিকল্পনা ক্যাম্পেইন শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। সেই ক্যাম্পেইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে এ ব্রিফিংয়ের আয়োজন।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রশ্নে মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৪ হাজার ৩৫৬ জন। এর মধ্যে ৮৮ হাজার ২৯৯ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে সুস্থ হওয়ার হার প্রায় ৯০ শতাংশ। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়মিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ডেঙ্গু আক্রান্তদের অনেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
বছরব্যাপী পরিবার পরিকল্পনা ক্যাম্পেইন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আগামী ১ ডিসেম্বর ক্যাম্পেইন উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ক্যাম্পেইন চলাকালে সারাদেশে জন্মনিরোধক সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হবে। ২০২৭ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এ কর্মসূচি।
এদিকে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য করতে চলতি অর্থবছরে ১৭টি রেডিওথেরাপি মেশিন কেনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন সরদার সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বলেন, এর মধ্যে ছয়টি মেশিন ঢাকার হাসপাতালগুলোতে স্থাপন করা হবে। বাকি ১১টি ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে দেওয়া হবে। এ ছাড়া ক্যানসার রোগীদের উন্নতমানের অস্ত্রোপচার সুবিধা দিতে পাঁচটি রোবটিক সার্জারি মেশিন কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
পিপলসনিউজ/আরইউ